জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং: জিনের পুনর্গঠন ও জিএমও

জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং কী, রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ প্রযুক্তি, জিএমও (GMO), কৃষি ও চিকিৎসায় (ইনসুলিন) এর ব্যবহার এবং প্রভাব নিয়ে আলোচনা। HSC ICT Chapter 1.

শেখা শুরু করুন

জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং: জিনের পুনর্গঠন ও জিএমও

  1. জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং: জিনের পুনর্গঠন ও জিএমও
  2. প্রকৃতির নিয়ম কি আমরা ভাঙছি?
  3. জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং কী?
  4. রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ (Recombinant DNA)
  5. রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ তৈরির ধাপসমূহ
  6. কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহার: সুপার ক্রপস
  7. চিকিৎসাক্ষেত্রে বিপ্লব: ইনসুলিন
  8. জিএমও (GMO) বা ট্রান্সজেনিক জীব
  9. সুবিধা বনাম ঝুঁকি
  10. সারসংক্ষেপ
  11. ধন্যবাদ

জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং: জিনের পুনর্গঠন ও জিএমও

এই লেকচার শেষে আমরা-

১। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং (Genetic Engineering) এর সংজ্ঞা বলতে পারব।
২। রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ (Recombinant DNA) প্রযুক্তি ব্যাখ্যা করতে পারব।
৩। জিএমও (GMO) বা ট্রান্সজেনিক জীবের ধারণা লাভ করব।
৪। কৃষি, চিকিৎসা ও শিল্পক্ষেত্রে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ব্যবহার ও ঝুঁকি বিশ্লেষণ করতে পারব।

প্রিয় শিক্ষার্থীরা, স্বাগতম! আজকে আমরা বায়োলজি এবং টেকনোলজির এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ দেখব। আমাদের আজকের টপিক 'জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং'। এই লেকচার শেষে আমরা- ১। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর সংজ্ঞা বলতে পারব। ২। রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ প্রযুক্তি কীভাবে কাজ করে তা ব্যাখ্যা করতে পারব। ৩। জিএমও বা ট্রান্সজেনিক জীবের ধারণা লাভ করব এবং ৪। কৃষি ও চিকিৎসায় এর ব্যবহার ও ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করতে পারব। চলো শুরু করা যাক!

প্রকৃতির নিয়ম কি আমরা ভাঙছি?

তোমরা কি কখনো অন্ধকারে জ্বলজ্বল করা তামাক গাছ বা বিড়াল দেখেছো? মনে হতে পারে এটা কোনো সায়েন্স ফিকশন মুভি বা জাদুর গল্প। কিন্তু বাস্তবে বিজ্ঞানীরা জেলিফিশের জিন অন্য প্রাণীর শরীরে দিয়ে এমন অদ্ভুত কাজ করছেন। স্ক্রিনে তোমরা দেখতে পাচ্ছো একটি গাছ যা অন্ধকারে আলো দিচ্ছে। এটা কোনো জাদু নয়, এটা বিজ্ঞানের খেলা। প্রশ্ন হলো, মানুষ কীভাবে প্রকৃতির এই নিয়ম ভেঙে নতুন বৈশিষ্ট্য তৈরি করছে? চলো, সেই রহস্যটাই আজ জানব।

জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং কী?

সংজ্ঞা: কোনো জীবের ডিএনএ (DNA) বা জিনের পরিবর্তন ঘটিয়ে নতুন বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত জীব তৈরি করার কৌশল।

অন্য নাম:
* জেনেটিক মডিফিকেশন (Genetic Modification)
* জিন স্প্লিসিং (Gene Splicing)

মূল কথা: জিনের কাটা-ছেঁড়া করে কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্য আনা।

সহজ কথায়, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং হলো জীবের ব্লু-প্রিন্ট বা ডিএনএ এডিট করা। যেমন তোমরা ভিডিও এডিট করার সময় কোনো দৃশ্য কেটে বাদ দাও বা নতুন দৃশ্য জোড়া লাগাও, ঠিক তেমনি বিজ্ঞানীরা জীবের ডিএনএ কেটে সেখানে নতুন জিন বসিয়ে দেন। একে জেনেটিক মডিফিকেশন বা জিন স্প্লিসিংও বলা হয়। পাশের চিত্রটি খেয়াল করো, কীভাবে একটি ডিএনএ কেটে সেখানে নতুন একটি জিন বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এটাই হলো মূল কনসেপ্ট।

রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ (Recombinant DNA)

রিকম্বিনেন্ট (Recombinant) = Re (পুনরায়) + Combine (যুক্ত করা)।

ধারণা: ভিন্ন দুটি জীবের ডিএনএ অংশ কেটে জোড়া লাগিয়ে যে নতুন ডিএনএ তৈরি করা হয়, তাকে রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ বলে।

উদাহরণ: মানুষের ইনসুলিন তৈরির জিন ব্যাকটেরিয়ার ডিএনএ-তে যুক্ত করা।

এখন আসি খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা শব্দে - 'রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ'। শব্দটা ভাঙলে কী পাই? Re এবং Combine। মানে পুনরায় জোড়া লাগানো। যখন আমরা এক জীবের ডিএনএ অন্য জীবের ডিএনএ-র সাথে জোড়া দিই, তখন যে হাইব্রিড ডিএনএ-টা তৈরি হয়, সেটাই রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ। চিত্রে দেখো, নীল রঙের ডিএনএ আর লাল রঙের ডিএনএ মিলে একটি নতুন বৃত্তাকার ডিএনএ তৈরি করেছে। এটা অনেকটা কফি আর দুধ মিশিয়ে নতুন পানীয় বানানোর মতো, যেখানে দুটোর বৈশিষ্ট্যই থাকে।

রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ তৈরির ধাপসমূহ

এই প্রক্রিয়াটা মূলত ৫টি ধাপে সম্পন্ন হয়। ধাপগুলো খুব ভালো করে খেয়াল করো, এই চিত্রটা কিন্তু তোমাদের মনে রাখতে হবে। ১। প্রথমে আমরা কাঙ্ক্ষিত জিনটি নির্বাচন বা সিলেক্ট করি। ২। এরপর সেটা কাটি। কাটব কী দিয়ে? কাঁচি দিয়ে? না, এক বিশেষ এনজাইম দিয়ে যার নাম 'রেস্ট্রিকশন এনজাইম'। একে মলিকুলার সিজার বা আণবিক কাঁচি বলা হয়। ৩। এরপর সেটা বহনের জন্য বাহক বা প্লাজমিড নিই। ৪। এবার জোড়া লাগানোর পালা। জোড়া লাগাতে লাগে 'লাইগেজ এনজাইম' বা আণবিক আঠা। ৫। সবশেষে এটা ব্যাকটেরিয়ার পেটে ঢুকিয়ে দিই, যাকে বলে ট্রান্সফরমেশন।

কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহার: সুপার ক্রপস

১. পোকা প্রতিরোধী জাত:
* বিটি বেগুন (Bt Brinjal): পোকা এই বেগুন খেলে মারা যায়। বাংলাদেশে এর সফল চাষ হচ্ছে।
* বিটি কটন (Bt Cotton)।

২. পুষ্টি বৃদ্ধি:
* গোল্ডেন রাইস (Golden Rice): সাধারণ ভাতের চেয়ে এতে ভিটামিন-এ (বিটা ক্যারোটিন) বেশি থাকে।

৩. সহনশীলতা:
* লবণাক্ততা ও খরা সহনশীল ধান।

কৃষিতে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এক বিপ্লব এনেছে। আমাদের দেশেই দেখো - বিটি বেগুন। চিত্রে বাম পাশে দেখো পোকা ধরা বেগুন, আর ডান পাশে সুস্থ বিটি বেগুন। আগে বেগুনে পোকা লাগত, প্রচুর কীটনাশক দিতে হতো। এখন জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং করে এমন বেগুন বানানো হয়েছে যা নিজেই পোকা মারতে পারে! আবার গোল্ডেন রাইস-এর কথা ভাবো, যা সাধারণ চালের চেয়ে বেশি ভিটামিন-এ দেয়। অর্থাৎ, আমরা এখন সুপার-ফুড তৈরি করতে পারছি।

চিকিৎসাক্ষেত্রে বিপ্লব: ইনসুলিন

১. ইনসুলিন তৈরি:
* আগে মাছ বা পশুর অগ্ন্যাশয় থেকে সংগ্রহ করা হতো।
* এখন ই-কোলাই (E. coli) ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে মানুষের ইনসুলিন তৈরি হয়।

২. ভ্যাকসিন ও হরমোন:
* হেপাটাইটিস-বি এর টিকা।
* গ্রোথ হরমোন (Growth Hormone)।

চিকিৎসায় সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো ইনসুলিন। ডায়াবেটিস রোগীদের এটা নিয়মিত নিতে হয়। আগে গরু বা শুকরের শরীর থেকে এটা নেওয়া হতো যা খুব ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। এখন আমরা মানুষের ইনসুলিন তৈরির জিনটা ব্যাকটেরিয়ার শরীরে ঢুকিয়ে দিয়েছি। চিত্রে দেখো, ব্যাকটেরিয়া এখন আমাদের জন্য ইনসুলিন তৈরির ফ্যাক্টরি হয়ে গেছে! ট্যাংকের মধ্যে ব্যাকটেরিয়া বংশবৃদ্ধি করে আর সাথে সাথে ইনসুলিনও তৈরি করে। চিন্তা করতে পারো কত বড় সুবিধা এটা?

জিএমও (GMO) বা ট্রান্সজেনিক জীব

পূর্ণরূপ: Genetically Modified Organism.

সংজ্ঞা: জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং প্রযুক্তির মাধ্যমে যে জীবের জিনোম পরিবর্তন করা হয়েছে, তাকে জিএমও বা ট্রান্সজেনিক জীব বলে।

উদাহরণ:
* ল্যাবরেটরিতে তৈরি বিশেষ ইঁদুর।
* উন্নত জাতের ভুট্টা বা সয়াবিন।
* বিটি বেগুন।

আমরা প্রায়ই খবরের কাগজে GMO শব্দটা দেখি। এর পূর্ণরূপ হলো Genetically Modified Organism। সহজ বাংলায়, যে জীবের জিন আমরা ল্যাবে মডিফাই করেছি। এদেরকে ট্রান্সজেনিক জীবও বলা হয়। বাজারে আমরা যে বড় বড় ভুট্টা, সয়াবিন বা এই যে বিটি বেগুনের কথা বললাম - এগুলো সবই জিএমও। অর্থাৎ প্রকৃতিতে এরা স্বাভাবিকভাবে ছিল না, মানুষ এদের ডিজাইন করেছে।

সুবিধা বনাম ঝুঁকি

সুবিধা (Benefits)
  • ফলন বৃদ্ধি: কম জমিতে বেশি ফসল।
  • রোগ মুক্তি: চিকিৎসায় ইনসুলিন ও ভ্যাকসিন।
  • খরচ হ্রাস: কৃষিতে কীটনাশকের ব্যবহার কমা।
  • পুষ্টিমান: ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবার।

এতক্ষণ তো শুধু সুবিধার কথা বললাম। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। দেখো, একদিকে যেমন আমরা উচ্চ ফলন পাচ্ছি, রোগ থেকে মুক্তি পাচ্ছি। অন্যদিকে এর কিছু ভয়াবহ ঝুঁকিও আছে। ভাবো তো, আমরা যদি এমন আগাছা তৈরি করে ফেলি যা কোনো ওষুধেই মরে না? একে বলে সুপার উইড। আবার জিএমও খাবার খেয়ে মানুষের নতুন নতুন অ্যালার্জি হতে পারে। দেশীয় ফলের জাত হারিয়ে যেতে পারে। তাই বিজ্ঞানীরা এখন বায়ো-সেফটি বা জীব-নিরাপত্তা নিয়ে খুব সতর্ক।

সারসংক্ষেপ

আজ আমরা যা শিখলাম:

  • জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং হলো ডিএনএ পরিবর্তনের প্রযুক্তি।
  • রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ তৈরিতে 'রেস্ট্রিকশন এনজাইম' (কাটার জন্য) ও 'লাইগেজ' (জোড়া লাগানোর জন্য) ব্যবহৃত হয়।
  • এই প্রযুক্তিতে ইনসুলিন, বিটি বেগুন ও উচ্চ ফলনশীল ফসল তৈরি করা হচ্ছে।
  • জিএমও (GMO) এর সুবিধা থাকলেও পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনা করা জরুরি।

তাহলে আজ আমরা জানলাম, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং আধুনিক বিজ্ঞানের এক বিস্ময়। আমরা শিখলাম কীভাবে আণবিক কাঁচি আর আঠা দিয়ে ডিএনএ এডিট করা হয় এবং কীভাবে তা আমাদের কৃষি ও চিকিৎসায় কাজে লাগছে। তবে এর ঝুঁকি সম্পর্কেও আমাদের সচেতন থাকতে হবে। আশা করি তোমরা পুরো বিষয়টা এখন ভিজুয়ালাইজ করতে পারছ।

ধন্যবাদ

পড়াশোনার টিপস:

  • রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ-র ধাপগুলোর চিত্র নিজে আঁকার চেষ্টা করো।
  • এনজাইমগুলোর নাম (রেস্ট্রিকশন ও লাইগেজ) ভালো করে মনে রাখো।

কোনো প্রশ্ন থাকলে অবশ্যই জানাবে।

আজকের টপিকটা কিন্তু একটু কঠিন মনে হতে পারে, তাই ভিডিওটা প্রয়োজনে আবার দেখো। বিশেষ করে রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ তৈরির ৫টি ধাপ খাতায় নিজে নিজে আঁকার চেষ্টা করবে। এটা বুঝলে বায়োলজি এবং আইসিটি দুটোতেই তোমাদের কনফিডেন্স বাড়বে। আমাদের পরের ক্লাসে আমরা জানব ক্ষুদ্র এক জগত সম্পর্কে - ন্যানোটেকনোলজি। সবাইকে ধন্যবাদ, ভালো থেকো!

জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং: জিনের পুনর্গঠন ও জিএমও

পড়তে প্রায় 25 মিনিট

১৯৮৬ সালে বিজ্ঞানীরা তামাক গাছে জোনাকি পোকার জিন প্রবেশ করিয়ে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটিয়েছিলেন—তামাক গাছটি অন্ধকারের মধ্যে জোনাকির মতোই জ্বলজ্বল করছিল। এটি কোনো সায়েন্স ফিকশন বা জাদুর গল্প নয়; এটি ছিল বিজ্ঞানের এক যুগান্তকারী আবিষ্কারের ফলাফল। যে প্রযুক্তির বদৌলতে জীবের এই মৌলিক নকশা বা 'ব্লু-প্রিন্ট' পরিবর্তন করা সম্ভব হয়েছে, তাকেই আমরা বলি জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং।

আজকের বিশ্বে আমাদের খাদ্যের যোগান থেকে শুরু করে জীবনরক্ষাকারী ওষুধ—সবকিছুর পেছনেই রয়েছে এই প্রযুক্তির অবদান। কীভাবে একটি জীবের ডিএনএ কেটে অন্য জীবের দেহে জোড়া লাগানো হয়? কীভাবে তৈরি হয় মানুষের ইনসুলিন বা পোকা-প্রতিরোধী বেগুন? এই অধ্যায়ে আমরা সেই আণবিক কাঁচি ও আঠার অবিশ্বাস্য জগত সম্পর্কে বিস্তারিত জানব, যা পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং: সংজ্ঞা ও ধারণা

সহজ কথায়, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং হলো জীবের বৈশিষ্ট্য পরিবর্তনের আধুনিক প্রযুক্তি। সনাতন প্রজনন বা 'ব্রিডিং' (Breeding) পদ্ধতিতে নতুন জাত উদ্ভাবন করতে বছরের পর বছর সময় লেগে যেত এবং ফলাফলও সবসময় নিখুঁত হতো না। কিন্তু জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে আমরা অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে এবং অল্প সময়ে কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন জীব তৈরি করতে পারি। একে অনেক সময় 'মলিকুলার সার্জারি'ও বলা হয়, কারণ এখানে কোষের অণুর স্তরে কাটা-ছেঁড়া করা হয়।

সংজ্ঞা (Definition): জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং (Genetic Engineering) হলো এমন একটি প্রযুক্তি বা প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট জীব থেকে কাঙ্ক্ষিত ডিএনএ বা জিন পৃথক করে অন্য কোনো জীবের দেহে স্থানান্তর ও সমন্বয়ের মাধ্যমে নতুন ও উন্নত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন জীব সৃষ্টি করা হয়।

এই প্রযুক্তির মূল ভিত্তি হলো ডিএনএ-র পুনর্গঠন। তাই একে রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ প্রযুক্তি (Recombinant DNA Technology) বা জিন স্প্লাইসিং (Gene Splicing) ও বলা হয়।

গুরুত্বপূর্ণ (Important):
- জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং জীবের জিনোমকে (Genome) পরিবর্তন করে নতুন বৈশিষ্ট্য দান করে।
- ১৯৭২ সালে পল বার্গ (Paul Berg) প্রথম রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ অণু তৈরি করেন, তাই তাঁকে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জনক বলা হয়। এটি এমসিকিউ (MCQ)-এর জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
- সনাতন প্রজনন প্রক্রিয়ায় হাজার হাজার জিনের মিশ্রণ ঘটে, কিন্তু জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মাত্র একটি বা কয়েকটি নির্দিষ্ট জিন স্থানান্তর করা হয়।

রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ প্রযুক্তি: ধাপসমূহ

রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ প্রযুক্তি হলো জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রাণ। পরীক্ষায় প্রায়ই এই প্রক্রিয়ার ধাপগুলো বর্ণনা করতে বলা হয়। সহজ ভাষায়, এটি হলো দুটি ভিন্ন জীবের ডিএনএ জোড়া লাগিয়ে নতুন ডিএনএ তৈরি করার প্রক্রিয়া। নিচে এই প্রক্রিয়ার ধারাবাহিক ধাপগুলো আলোচনা করা হলো:

রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ প্রযুক্তির ধাপসমূহ

সংজ্ঞা (Definition): রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ (Recombinant DNA) বলতে ভিন্ন ভিন্ন উৎস থেকে ডিএনএ অনু সংগ্রহ করে কৃত্রিম উপায়ে জোড়া লাগিয়ে যে নতুন ডিএনএ তৈরি করা হয়, তাকে বোঝায়।

রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ তৈরির প্রক্রিয়াটি মূলত ৬টি ধাপে সম্পন্ন হয়:

১. কাঙ্ক্ষিত ডিএনএ নির্বাচন ও পৃথকীকরণ (Selection & Isolation of DNA):
প্রথমে যে জীবের বৈশিষ্ট্য আমরা অন্য জীভে নিতে চাই, সেই দাতা জীব (Donor Organism) থেকে কাঙ্ক্ষিত জিনসহ ডিএনএ অণুকে শনাক্ত এবং পৃথক করা হয়।

২. বাহক বা ভেক্টর নির্বাচন (Selection of Vector):
কাঙ্ক্ষিত জিনটিকে অন্য কোষে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি বাহক বা 'ভেক্টর' প্রয়োজন হয়। এ কাজে সাধারণত ব্যাকটেরিয়ার প্লাজমিড (Plasmid) ব্যবহার করা হয়। প্লাজমিড হলো ব্যাকটেরিয়ার মূল ডিএনএ ছাড়াও বৃত্তাকার অতিরিক্ত ডিএনএ, যা স্বাধীনভাবে বংশবৃদ্ধি করতে পারে।

৩. ডিএনএ কর্তন (Restriction Digestion):
এই ধাপে একটি বিশেষ এনজাইম ব্যবহার করে দাতা জীবের ডিএনএ থেকে কাঙ্ক্ষিত অংশটি কেটে নেওয়া হয়। একই এনজাইম দিয়ে প্লাজমিড ডিএনএ-রও একটি নির্দিষ্ট অংশ কেটে ফেলা হয়। এই এনজাইমকে বলা হয় রেস্ট্রিকশন এনজাইম (Restriction Enzyme)। এটি আণবিক কাঁচি হিসেবে কাজ করে।

৪. ডিএনএ সংযোগ (Ligation):
কাটা প্লাজমিডের ফাঁকা জায়গায় দাতা জীবের কাঙ্ক্ষিত জিনটি বসিয়ে দেওয়া হয়। এরপর লাইগেজ (Ligase) নামক এনজাইম দিয়ে কাটা প্রান্তগুলো জোড়া লাগানো হয়। লাইগেজ এনজাইম এখানে আণবিক আঠা হিসেবে কাজ করে। এর ফলে যে নতুন ডিএনএ অণুটি তৈরি হয়, সেটিই হলো রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ

৫. পোষক দেহে প্রবেশকরণ (Transformation):
তৈরিকৃত রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ অণুটিকে এবার একটি পোষক কোষে (সাধারণত E. coli ব্যাকটেরিয়া) প্রবেশ করানো হয়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় ট্রান্সফরমেশন (Transformation)। যে ব্যাকটেরিয়াটি রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ গ্রহণ করে, তাকে বলা হয় 'ট্রান্সজেনিক জীব'।

৬. জিনের ক্লোনিং বা সংখ্যাবৃদ্ধি (Cloning):
ট্রান্সফরমেশনের পর ব্যাকটেরিয়াগুলোকে উপযুক্ত পরিবেশে বংশবৃদ্ধির সুযোগ দেওয়া হয়। ব্যাকটেরিয়া যখন বিভাজিত হয়ে সংখ্যাবৃদ্ধি করে, তখন এর ভেতরের রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ-ও বিভাজিত হয়। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত জিনের অসংখ্য কপি বা ক্লোন তৈরি হয়ে যায়।

পরীক্ষার টিপস (Exam Tip): উদ্দীপকে যদি 'কাঁচি দিয়ে ডিএনএ কাটা' এবং 'আঠা দিয়ে জোড়া লাগানো'র কোনো ইঙ্গিত থাকে, তবে বুঝবে প্রশ্নটি রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ প্রযুক্তি নিয়ে। উত্তর লেখার সময় ধাপগুলো ফ্লো-চার্ট আকারে লিখলে বেশি নম্বর পাওয়া যায়।

ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান (Tools)

জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং সফলভাবে সম্পন্ন করার জন্য তিনটি প্রধান 'টুল' বা উপাদান অপরিহার্য। এদের কাজ ভালোমতো বোঝা জরুরি।

১. রেস্ট্রিকশন এনজাইম (Restriction Enzyme)

একে বলা হয় 'আণবিক কাঁচি' (Molecular Scissor)। এটি ডিএনএ অণুর যেকোনো জায়গায় কাটে না, বরং খুব নির্দিষ্ট কিছু সিকোয়েন্স (Sequence) শনাক্ত করে এবং ঠিক সেই জায়গাতেই কাটে। যেমন: EcoRI একটি বহুল ব্যবহৃত রেস্ট্রিকশন এনজাইম।

সংজ্ঞা (Definition): রেস্ট্রিকশন এনজাইম হলো এক ধরণের প্রোটিন যা ডিএনএ অণুর নির্দিষ্ট নিউক্লিওটাইড সিকোয়েন্স শনাক্ত করে এবং ওই নির্দিষ্ট স্থানে ডিএনএ-কে কর্তন করতে সক্ষম।

২. লাইগেজ এনজাইম (Ligase Enzyme)

একে বলা হয় 'আণবিক আঠা' (Molecular Glue)। রেস্ট্রিকশন এনজাইম দিয়ে কাটা ডিএনএ খণ্ডগুলোকে জোড়া লাগাতে এই এনজাইম ব্যবহার করা হয়। এটি ডিএনএ-র সুগার ও ফসফেটের মধ্যে বন্ধন তৈরি করে কাটা অংশগুলো সিল করে দেয়।

৩. প্লাজমিড (Plasmid)

ব্যাকটেরিয়া কোষের সাইটোপ্লাজমে মূল ক্রোমোজোমের বাইরে যে ছোট, বৃত্তাকার, দ্বি-সূত্রক ডিএনএ অণু থাকে, তাকে প্লাজমিড বলে। প্লাজমিড স্ববিভাজনে সক্ষম এবং এটি সহজেই অন্য ব্যাকটেরিয়ায় স্থানান্তর করা যায় বলে একে আদর্শ ভেক্টর বা বাহক হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

গুরুত্বপূর্ণ (Important): প্লাজমিডের কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য থাকার কারণেই একে ভেক্টর হিসেবে বেছে নেওয়া হয়:
- এটি আকারে ছোট এবং বৃত্তাকার।
- এটি অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধে সক্ষম জিন বহন করে (যা স্ক্রিনিংয়ে সাহায্য করে)।
- এটি দ্রুত সংখ্যাবৃদ্ধি করতে পারে।

জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ব্যবহার (বিশ্ব ও বাংলাদেশ প্রেক্ষিত)

বর্তমান বিশ্বে কৃষি, চিকিৎসা ও পরিবেশ রক্ষায় এই প্রযুক্তির ব্যবহার অপরিসীম।

১. কৃষি ক্ষেত্রে
  • উচ্চ ফলনশীল জাত: বিভিন্ন শস্যের জিন পরিবর্তন করে অধিক ফলনশীল জাত তৈরি করা হয়েছে।
  • পোকামাকড় ও রোগ প্রতিরোধ: ফসলের ক্ষতিকারক পোকা দমনের জন্য ব্যাকটেরিয়া থেকে বিষাক্ত জিন ফসলে স্থানান্তর করা হয়েছে। যেমন: বিটি বেগুনবিটি তুলা। বিটি (Bt) জিনটি Bacillus thuringiensis নামক ব্যাকটেরিয়া থেকে নেওয়া।
  • পুষ্টিমান বৃদ্ধি: ধানের জিন পরিবর্তন করে ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ 'গোল্ডেন রাইস' তৈরি করা হয়েছে, যা রাতকানা রোগ প্রতিরোধে সহায়ক।
  • নাইট্রোজেন ফিক্সেশন: রাইজোবিয়াম ব্যাকটেরিয়ার নাইট্রোজেন সংবন্ধনকারী জিন অন্য উদ্ভিদে স্থানান্তর করে সারের ব্যবহার কমানো সম্ভব হচ্ছে।
২. চিকিৎসা ক্ষেত্রে
  • ইনসুলিন উৎপাদন: ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য অপরিহার্য ইনসুলিন এখন ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে তৈরি করা হয়।
  • টিকা ও ইন্টারফেরন: হেপাটাইটিস-বি এর টিকা এবং ক্যান্সার ও ভাইরাসজনিত রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত 'ইন্টারফেরন' (Interferon) এখন এই প্রযুক্তিতে তৈরি হচ্ছে।
  • জিন থেরাপি: মানুষের ত্রুটিপূর্ণ জিন পরিবর্তন করে সুস্থ জিন প্রতিস্থাপন করার চিকিৎসায় এটি ব্যবহৃত হয়।

উদাহরণ (Example) - ইনসুলিন উৎপাদন: মানুষের অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন তৈরির জিনটি E. coli ব্যাকটেরিয়ার প্লাজমিডে প্রবেশ করিয়ে বাণিজ্যিকভাবে ইনসুলিন তৈরি করা হয়। একে 'হিউমুলিন' (Humulin) বলা হয়। এটি প্রাণীর অগ্ন্যাশয় থেকে সংগৃহীত ইনসুলিনের চেয়ে অনেক নিরাপদ ও সস্তা।

৩. শিল্প ও পরিবেশ রক্ষায়
  • তেল অপসারণ: সমুদ্রের পানিতে তেল ছড়িয়ে পড়লে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হয়। Pseudomonas গণের এক ধরণের জেনেটিক্যালি মডিফাইড ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করে এই তেল দ্রুত ও কার্যকরভাবে অপসারণ করা সম্ভব। একে 'অয়েল ইটিং ব্যাকটেরিয়া' বা 'সুপার বাগ' বলা হয়।

বাংলাদেশ প্রেক্ষিত: বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) উদ্ভাবিত ৪টি বিটি বেগুনের জাত (BARI Bt Brinjal 1, 2, 3, 4) বাংলাদেশে সফলভাবে চাষ হচ্ছে। এটি দক্ষিণ এশিয়ায় জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের একটি বড় সাফল্য।

জিএমও (GMO) এবং এর প্রভাব

সংজ্ঞা (Definition): জিএমও (GMO) বা Genetically Modified Organism বলতে সেই সব জীবকে বোঝায়, যাদের জিনোম বা ডিএনএ বিন্যাস জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে। এদের ট্রান্সজেনিক জীবও (Transgenic Organism) বলা হয়।

জিএমও শস্য বা প্রাণীর ব্যবহার নিয়ে বিশ্বে বিতর্ক রয়েছে। এর সুবিধা ও অসুবিধার একটি তুলনামূলক চিত্র নিচে দেওয়া হলো:

বিষয় সুবিধা (Pros) অসুবিধা বা ঝুঁকি (Cons)
কৃষি কম জমিতে অধিক ফলন এবং পোকামাকড় ও আগাছানাশক খরচ কমে। স্থানীয় জাতের সাথে সংকরায়ণের ফলে জীববৈচিত্র্য হ্রাস পেতে পারে।
পরিবেশ রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কমে পরিবেশ দূষণ কমায়। অনিয়ন্ত্রিতভাবে ছড়িয়ে পড়লে 'সুপার উইড' বা অতি-আগাছা তৈরি হতে পারে যা দমন করা কঠিন।
স্বাস্থ্য ফসলের পুষ্টিমান বৃদ্ধি পায় (যেমন: গোল্ডেন রাইস)। কিছু মানুষের দেহে নতুন প্রোটিন অ্যালার্জি বা বিষক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।

বায়োসেফটি (Biosafety): জিএমও ব্যবহারের ফলে পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর যাতে কোনো ক্ষতিকর প্রভাব না পড়ে, সে জন্য যে নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তাকে বায়োসেফটি বলে। বাংলাদেশেও জিএমও শস্য ছাড়করণের ক্ষেত্রে কঠোর বায়োসেফটি নীতিমালা অনুসরণ করা হয়।

সারসংক্ষেপ ও পরীক্ষার প্রস্তুতি

সংক্ষিপ্ত সারাংশ (Quick Revision):
- জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং: ডিএনএ অণু কেটে ও জোড়া লাগিয়ে জীবের বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন করা।
- রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ: ভিন্ন উৎসের ডিএনএ-র সংযোগে তৈরি নতুন ডিএনএ।
- মূল ধাপ: ডিএনএ নির্বাচন -> বাহক নির্বাচন (প্লাজমিড) -> কর্তন (রেস্ট্রিকশন এনজাইম) -> সংযোগ (লাইগেজ) -> ট্রান্সফরমেশন -> ক্লোনিং।
- ব্যবহার: ডায়াবেটিসের জন্য ইনসুলিন, পোকা প্রতিরোধী বিটি বেগুন।
- সতর্কতা: জিএমও শস্যের পরিবেশগত ঝুঁকি বা বায়োসেফটি।

পরীক্ষার টিপস (Exam Tip): সৃজনশীল প্রশ্নে (Creative Question) সাধারণত কোনো কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে 'নতুন জাতের ফসল' বা ল্যাবে 'ব্যাকটেরিয়া থেকে ওষুধ' তৈরির দৃশ্যপট (Scenario) দেওয়া থাকে।
- 'গ' নম্বরে সাধারণত প্রযুক্তির ধাপগুলো (রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ) জানতে চাওয়া হয়। এখানে চিত্র ও ফ্লো-চার্ট দেওয়া মাস্ট।
- 'ঘ' নম্বরে এর প্রভাব, গুরুত্ব বা ঝুঁকি বিশ্লেষণ করতে বলা হয়। তখন কৃষি ও চিকিৎসার পয়েন্টগুলো এবং জিএমও-র সুবিধা-অসুবিধা লিখতে হবে।

পরিভাষা (Glossary)

শব্দ (Term) সংজ্ঞা (Definition)
রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ পুনর্গঠিত ডিএনএ যা ভিন্ন ভিন্ন উৎসের ডিএনএ-র সমন্বয়ে তৈরি।
প্লাজমিড ব্যাকটেরিয়ার মূল ডিএনএ বহির্ভূত বৃত্তাকার ডিএনএ যা ভেক্টর হিসেবে কাজ করে।
রেস্ট্রিকশন এনজাইম ডিএনএ অণুর নির্দিষ্ট স্থান কাটার জন্য ব্যবহৃত বিশেষ এনজাইম (আণবিক কাঁচি)।
ট্রান্সজেনিক জীব যে জীবের দেহে অন্য জীবের জিন কৃত্রিমভাবে প্রবেশ করানো হয়েছে।
জিন ক্লোনিং কোনো নির্দিষ্ট জিনের হুবহু প্রতিলিপি বা কপি তৈরি করার প্রক্রিয়া।
লাইগেজ ডিএনএ খণ্ড জোড়া লাগানোর এনজাইম (আণবিক আঠা)।

অনুশীলনের প্রশ্ন

সৃজনশীল প্রশ্ন

সৃজনশীল প্রশ্ন ১

উদ্দীপক: কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা দীর্ঘ গবেষণার পর টমেটোর এমন একটি নতুন জাত উদ্ভাবন করেছেন যা তীব্র শীতেও ফলন দিতে সক্ষম এবং বিশেষ পোকার আক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় তারা অন্য একটি জীবের জিন টমেটোর জিনে প্রতিস্থাপন করেছেন। এর ফলে কৃষকরা এখন সারা বছর টমেটো চাষ করতে পারছেন।

ক) জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং কী?
খ) জিএমও (GMO) বলতে কী বোঝায়?
গ) উদ্দীপকে টমেটো উৎপাদনে যে প্রযুক্তিটি ব্যবহৃত হয়েছে, তার ধাপগুলো বর্ণনা কর।
ঘ) "খাদ্য সংকট মোকাবেলায় উদ্দীপকে উল্লিখিত প্রযুক্তির ভূমিকা অপরিসীম"—উক্তিটি মূল্যায়ন কর।

উত্তর

(ক) জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং হলো এমন একটি প্রযুক্তি যার মাধ্যমে কোনো জীবের ডিএনএ বা জিনের পরিবর্তন ঘটিয়ে তার বৈশিষ্ট্যের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সাধন করা হয়।

(খ) জিএমও (GMO) বা Genetically Modified Organism বলতে সেইসব জীবকে বোঝায় যাদের জিনোম বা ডিএনএ গঠন জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে। সাধারণ প্রজনন প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে জিনের এই পরিবর্তন ঘটিয়ে উন্নত বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত (যেমন: রোগ প্রতিরোধক্ষম, অধিক ফলনশীল) যে জীব তৈরি হয়, তাই জিএমও।

(গ) উদ্দীপকে টমেটো উৎপাদনে রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ প্রযুক্তি (Recombinant DNA Technology) বা জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যবহৃত হয়েছে। নিচে এর ধাপগুলো বর্ণনা করা হলো:

  1. ডিএনএ নির্বাচন: প্রথমে কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন (যেমন: শীত ও পোকা প্রতিরোধী) জিন বহনকারী ডিএনএ খণ্ড এবং বাহক হিসেবে একটি প্লাজমিড ডিএনএ নির্বাচন করা হয়।
  2. ডিএনএ কর্তন: 'রেস্ট্রিকশন এনজাইম' ব্যবহার করে কাঙ্ক্ষিত জিন এবং প্লাজমিড ডিএনএ-র নির্দিষ্ট অংশ কেটে নেওয়া হয়।
  3. সংযোজন: 'লাইগেজ এনজাইম' এর সাহায্যে কাঙ্ক্ষিত জিনটি প্লাজমিডের কাটা অংশে জোড়া লাগিয়ে রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ তৈরি করা হয়।
  4. পোষক দেহে প্রবেশ: এরপর এই রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ বা প্লাজমিডটি ব্যাকটেরিয়া বা অন্য কোনো পোষক কোষে (এখানে টমেটো কোষের টিস্যু কালচারে) প্রবেশ করানো হয়, যাকে 'ট্রান্সফরমেশন' বলে।
  5. বহিঃপ্রকাশ: অবশেষে জিনের বহিঃপ্রকাশ ঘটে এবং নতুন বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন (শীত ও পোকা প্রতিরোধী) টমেটো চারা উৎপন্ন হয়।

(ঘ) "খাদ্য সংকট মোকাবেলায় উদ্দীপকে উল্লিখিত প্রযুক্তির ভূমিকা অপরিসীম"—উক্তিটি অত্যন্ত যথার্থ। উদ্দীপকে নির্দেশিত প্রযুক্তিটি হলো জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, যা আধুনিক কৃষিক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটিয়েছে।

বিশ্বের জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং চাষযোগ্য জমির পরিমাণ কমছে। এই পরিস্থিতিতে সনাতন পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে বিপুল জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটানো প্রায় অসম্ভব। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং প্রযুক্তির মাধ্যমে:
১. প্রতিকূল পরিবেশে চাষাবাদ: উদ্দীপকের টমেটোর মতো খরা, লবণাক্ততা বা তীব্র শীত সহনশীল জাত উদ্ভাবন করা সম্ভব হচ্ছে, ফলে অনাবাদি জমিতেও ফসল ফলানো যাচ্ছে।
২. রোগ ও পোকা প্রতিরোধ: ফসলের পোকা ও রোগ প্রতিরোধী জাত (যেমন: Bt বেগুন, Bt তুলা) তৈরি করায় কীটনাশকের ব্যবহার কমছে এবং ফসলের অপচয় রোধ হচ্ছে।
৩. পুষ্টিমান বৃদ্ধি: সাধারণ ধানের চেয়ে বেশি ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ 'গোল্ডেন রাইস' এর মতো শস্য তৈরি করা সম্ভব হয়েছে যা পুষ্টিহীনতা দূর করতে সহায়ক।
৪. ফলন বৃদ্ধি: এই প্রযুক্তিতে খুব কম সময়ে অধিক ফলনশীল জাত তৈরি করা যায়।

সুতরাং, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং পরিবেশের ক্ষতি না করে টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ভূমিকা অনস্বীকার্য।


সৃজনশীল প্রশ্ন ২

উদ্দীপক: ডা. রফিক তার ডায়াবেটিস আক্রান্ত রোগীদের জন্য ল্যাবরেটরিতে তৈরি বিশেষ এক ধরণের ইনসুলিন প্রেসক্রাইব করেন। আগে এই ইনসুলিন গরু বা শুকরের অগ্ন্যাশয় থেকে সংগ্রহ করা হতো, যা ছিল ব্যয়বহুল এবং অনেক সময় পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিত। বর্তমানে একটি বিশেষ ব্যাকটেরিয়ার ডিএনএ পরিবর্তনের মাধ্যমে এটি বাণিজ্যিকভাবে তৈরি হচ্ছে।

ক) প্লাজমিড কী?
খ) জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও বায়োইনফরমেটিক্সের সম্পর্ক ব্যাখ্যা কর।
গ) উদ্দীপকে উল্লিখিত ইনসুলিন তৈরির প্রক্রিয়াটি চিত্রসহ বর্ণনা কর।
ঘ) উদ্দীপকের প্রযুক্তির পরিবেশগত প্রভাব ও নৈতিক দিক বিশ্লেষণ কর।

উত্তর

(ক) প্লাজমিড হলো ব্যাকটেরিয়ার কোষের ক্রোমোজোম বহির্ভূত বৃত্তাকার ডিএনএ অণু, যা স্বাধীনভাবে অনুলিপন বা বিভাজনে সক্ষম।

(খ) জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও বায়োইনফরমেটিক্স একে অপরের পরিপূরক। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং গবেষণায় প্রচুর পরিমাণে জৈবিক ডেটা (যেমন: ডিএনএ সিকোয়েন্স, জিনের গঠন) বিশ্লেষণ করতে হয়। বায়োইনফরমেটিক্স এই বিপুল ডেটা সংরক্ষণ, বিশ্লেষণ এবং মডেলিংয়ে সাহায্য করে। যেমন—কোনো নির্দিষ্ট জিনের কাজ কী বা কোনো জিনের সিকোয়েন্স কেমন হবে, তা বায়োইনফরমেটিক্স টুলের মাধ্যমে আগে থেকেই বিশ্লেষণ করা যায়, যা জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কাজকে দ্রুত ও নির্ভুল করে।

(গ) উদ্দীপকে উল্লিখিত ইনসুলিন তৈরির প্রক্রিয়াটি রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ প্রযুক্তি ব্যবহার করে সম্পন্ন হয়। নিচে এর প্রক্রিয়া বর্ণনা করা হলো:

  1. জিন সংগ্রহ: প্রথমে মানবদেহের অগ্ন্যাশয় কোষ থেকে ইনসুলিন উৎপাদনকারী জিনটি শনাক্ত ও পৃথক করা হয়।
  2. প্লাজমিড নির্বাচন: ই. কোলাই (E. coli) ব্যাকটেরিয়া থেকে প্লাজমিড বের করে নেওয়া হয়।
  3. ডিএনএ কর্তন: রেস্ট্রিকশন এনজাইম দিয়ে প্লাজমিডের একটি অংশ এবং মানবদেহের ইনসুলিন জিনের অংশ কেটে নেওয়া হয়।
  4. রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ তৈরি: লাইগেজ এনজাইম দিয়ে ইনসুলিন জিনটি প্লাজমিডের কাটা অংশের সাথে যুক্ত করা হয়।
  5. ট্রান্সফরমেশন: এই পরিবর্তিত প্লাজমিডটি পুনরায় ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়ায় প্রবেশ করানো হয়।
  6. ক্লোনিং ও উৎপাদন: ব্যাকটেরিয়াগুলো ফার্মেন্টেশন ট্যাংকে দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে এবং তাদের শরীরের ভেতরে ইনসুলিন তৈরি হতে থাকে। পরে তা নিষ্কাশন ও শোধন করে ব্যবহারের উপযোগী করা হয়।

(ঘ) উদ্দীপকের প্রযুক্তিটি অর্থাৎ জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং মানবকল্যাণে আশীর্বাদস্বরূপ হলেও এর পরিবেশগত প্রভাব ও নৈতিক দিক নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

পরিবেশগত প্রভাব:
১. জীববৈচিত্র্য হ্রাস: জিএমও শস্য প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো শস্যের সাথে পরাগায়ন ঘটালে দেশীয় প্রজাতির বিশুদ্ধতা নষ্ট হতে পারে এবং জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়তে পারে।
২. সুপার বাগ বা সুপার উইড: পোকামাকড় বা আগাছা প্রতিরোধক জিএমও শস্যের বিরুদ্ধে পোকা বা আগাছা একসময় প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করতে পারে, যা ভবিষ্যতে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে (সুপার বাগ তৈরি)।
৩. ভারসাম্যহীনতা: খাদ্যশৃঙ্খলে জিএমও জীবের প্রবেশ বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।

নৈতিক দিক:
১. প্রাণী বা মানুষের জিনের পরিবর্তন প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মের লঙ্ঘন বলে অনেকে মনে করেন।
২. জিএমও পণ্য মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে কিনা তা নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে।

পরিশেষে বলা যায়, ইনসুলিন তৈরির মতো জীবনরক্ষাকারী ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির ব্যবহার অত্যন্ত ইতিবাচক হলেও, পরিবেশের ওপর এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিবেচনায় সতর্কতার সাথে এর প্রয়োগ করা উচিত।

এমসিকিউ

১। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং শব্দটি প্রথম কে ব্যবহার করেন?

ক) পল বার্গ
খ) জ্যাক উইলিয়ামসন
গ) স্ট্যানলি কোহেন
ঘ) ওয়াটসন ও ক্রিক

সঠিক উত্তর: খ) জ্যাক উইলিয়ামসন

ব্যাখ্যা: ১৯৫১ সালে জ্যাক উইলিয়ামসন তাঁর সায়েন্স ফিকশন বই 'ড্রাগনস আইল্যান্ড'-এ সর্বপ্রথম 'জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং' শব্দটি ব্যবহার করেন।


২। রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ তৈরিতে ডিএনএ কাটার জন্য কোন এনজাইম ব্যবহৃত হয়?

ক) লাইগেজ
খ) পলিমারেজ
গ) রেস্ট্রিকশন এনজাইম
ঘ) প্রোটিয়েজ

সঠিক উত্তর: গ) রেস্ট্রিকশন এনজাইম

ব্যাখ্যা: রেস্ট্রিকশন এনজাইমকে 'আণবিক কাঁচি' বলা হয়। এটি ডিএনএ-র নির্দিষ্ট সিকোয়েন্স শনাক্ত করে এবং কেটে ফেলতে সাহায্য করে। লাইগেজ এনজাইম জোড়া লাগাতে ব্যবহৃত হয়।


৩। প্লাজমিড সাধারণত কোন জীবে পাওয়া যায়?

ক) ভাইরাস
খ) ব্যাকটেরিয়া
গ) ছত্রাক
ঘ) শৈবাল

সঠিক উত্তর: খ) ব্যাকটেরিয়া

ব্যাখ্যা: ব্যাকটেরিয়া কোষের ক্রোমোজোম ছাড়াও যে বৃত্তাকার ডিএনএ থাকে, তাকে প্লাজমিড বলে। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে এটি বাহক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।


৪। রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ প্রযুক্তির ধাপ কোনটি?

ক) ডিএনএ নির্বাচন → ডিএনএ কর্তন → ডিএনএ সংযোজন → পোষক দেহে প্রবেশ
খ) ডিএনএ কর্তন → ডিএনএ নির্বাচন → পোষক দেহে প্রবেশ → ডিএনএ সংযোজন
গ) ডিএনএ সংযোজন → ডিএনএ কর্তন → ডিএনএ নির্বাচন → পোষক দেহে প্রবেশ
ঘ) ডিএনএ নির্বাচন → পোষক দেহে প্রবেশ → ডিএনএ কর্তন → ডিএনএ সংযোজন

সঠিক উত্তর: ক) ডিএনএ নির্বাচন → ডিএনএ কর্তন → ডিএনএ সংযোজন → পোষক দেহে প্রবেশ

ব্যাখ্যা: প্রথমে কাঙ্ক্ষিত ডিএনএ নির্বাচন করতে হয়, তারপর তা কাটতে হয়, এরপর বাহক ডিএনএর সাথে জোড়া লাগিয়ে শেষে পোষক দেহে প্রবেশ করানো হয়।


৫। ইনসুলিন তৈরির জন্য সাধারণত কোন ব্যাকটেরিয়া ব্যবহৃত হয়?

ক) Lactobacillus
খ) E. coli
গ) Salmonella
ঘ) Vibrio cholerae

সঠিক উত্তর: খ) E. coli

ব্যাখ্যা: Escherichia coli বা E. coli ব্যাকটেরিয়া খুব দ্রুত বংশবৃদ্ধি করতে পারে এবং এর জেনেটিক গঠন সরল হওয়ায় ইনসুলিন তৈরিতে এটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়।


৬। ট্রান্সজেনিক জীব বলতে কী বোঝায়?

ক) যাদের দেহে কৃত্রিম অঙ্গ আছে
খ) যাদের জিনোম অন্য জীবের জিন দ্বারা পরিবর্তিত
গ) যারা ল্যাবরেটরিতে তৈরি
ঘ) যারা ক্লোনিং এর মাধ্যমে তৈরি

সঠিক উত্তর: খ) যাদের জিনোম অন্য জীবের জিন দ্বারা পরিবর্তিত

ব্যাখ্যা: কোনো জীবের দেহে অন্য কোনো জীবের জিন প্রবেশ করিয়ে যে নতুন বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত জীব তৈরি করা হয়, তাকে ট্রান্সজেনিক জীব বা GMO বলে।


৭। 'গোল্ডেন রাইস'-এ কোন ভিটামিনের উপস্থিতি থাকে?

ক) ভিটামিন বি
খ) ভিটামিন সি
গ) ভিটামিন এ
ঘ) ভিটামিন ডি

সঠিক উত্তর: গ) ভিটামিন এ

ব্যাখ্যা: গোল্ডেন রাইস হলো জেনেটিকালি মডিফাইড ধান, যা বিটা-ক্যারোটিন সমৃদ্ধ। মানবদেহে এটি ভিটামিন এ-তে রূপান্তরিত হয়।


৮। ডিএনএ খণ্ড জোড়া লাগাতে কোন এনজাইম ব্যবহৃত হয়?

ক) অ্যামাইলেজ
খ) লাইগেজ
গ) পেপসিন
ঘ) লাইপেজ

সঠিক উত্তর: খ) লাইগেজ

ব্যাখ্যা: লাইগেজ এনজাইমকে 'আণবিক আঠা' বলা হয়। এটি দুটি ভিন্ন ডিএনএ খণ্ডকে রাসায়নিকভাবে সংযুক্ত করতে ব্যবহৃত হয়।


৯। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জনক কাকে বলা হয়?

ক) গ্রেগর জোহান মেন্ডেল
খ) চার্লস ডারউইন
গ) পল বার্গ
ঘ) আলেকজান্ডার ফ্লেমিং

সঠিক উত্তর: গ) পল বার্গ

ব্যাখ্যা: ১৯৭২ সালে পল বার্গ প্রথম রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ অণু তৈরি করেন, তাই তাকে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জনক বলা হয়।


১০। ইন্টারফেরন কী কাজে ব্যবহৃত হয়?

ক) ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে
খ) উচ্চ রক্তচাপ কমাতে
গ) ক্যান্সার ও ভাইরাস প্রতিরোধে
ঘ) রক্ত জমাট বাঁধতে

সঠিক উত্তর: গ) ক্যান্সার ও ভাইরাস প্রতিরোধে

ব্যাখ্যা: ইন্টারফেরন হলো এক ধরণের প্রোটিন যা দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে এবং ভাইরাস ও ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি দমনে ব্যবহৃত হয়।


১১। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রয়োগ ক্ষেত্র কোনটি?
i. চিকিৎসা বিজ্ঞান
ii. কৃষি ক্ষেত্র
iii. মহাকাশ গবেষণা

নিচের কোনটি সঠিক?
ক) i ও ii
খ) i ও iii
গ) ii ও iii
ঘ) i, ii ও iii

সঠিক উত্তর: ক) i ও ii

ব্যাখ্যা: জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং প্রধানত চিকিৎসা (ইনসুলিন, টিকা তৈরি) এবং কৃষি (উন্নত জাত উদ্ভাবন) ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। মহাকাশ গবেষণায় এর প্রত্যক্ষ প্রয়োগ নেই।


১২। জিএমও (GMO) শস্যের সুবিধা হলো—
i. পোকা মাকড় প্রতিরোধী
ii. অধিক পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ
iii. পরিবেশের জন্য সর্বদা নিরাপদ

নিচের কোনটি সঠিক?
ক) i ও ii
খ) i ও iii
গ) ii ও iii
ঘ) i, ii ও iii

সঠিক উত্তর: ক) i ও ii

ব্যাখ্যা: জিএমও শস্য পোকা প্রতিরোধী এবং পুষ্টিসমৃদ্ধ হতে পারে। তবে পরিবেশের ওপর এর প্রভাব নিয়ে বিতর্ক থাকায় এটি 'সর্বদা নিরাপদ' বলা যায় না।


১৩। রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত ভেক্টর বা বাহক হতে পারে—
i. প্লাজমিড
ii. ভাইরাস
iii. মশা

নিচের কোনটি সঠিক?
ক) i ও ii
খ) i ও iii
গ) ii ও iii
ঘ) i, ii ও iii

সঠিক উত্তর: ক) i ও ii

ব্যাখ্যা: ভেক্টর হিসেবে সাধারণত ব্যাকটেরিয়ার প্লাজমিড এবং কিছু ভাইরাস (ব্যাকেরিওফায) ব্যবহৃত হয়। মশা ভেক্টর হিসেবে কাজ করে না (এটি রোগের বাহক, জিনের নয়)।


১৪। জিন থেরাপি কী?

ক) জিনের গঠন পরিবর্তন করা
খ) ত্রুটিপূর্ণ জিনকে সুস্থ জিন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা
গ) নতুন জিন তৈরি করা
ঘ) জিনের অনুলিপি তৈরি করা

সঠিক উত্তর: খ) ত্রুটিপূর্ণ জিনকে সুস্থ জিন দ্বারা প্রতিস্থাপন করা

ব্যাখ্যা: জিন থেরাপি হলো এমন এক চিকিৎসা পদ্ধতি যেখানে রোগীর দেহের ত্রুটিপূর্ণ বা রোগাক্রান্ত জিনকে সুস্থ ও সচল জিন দিয়ে প্রতিস্থাপন করে রোগের চিকিৎসা করা হয়।


১৫। Bt বেগুন-এ 'Bt' কী নির্দেশ করে?

ক) Biotechnology
খ) Bacillus thuringiensis
গ) Botanical technology
ঘ) Bacteria type

সঠিক উত্তর: খ) Bacillus thuringiensis

ব্যাখ্যা: Bt হলো Bacillus thuringiensis নামক এক ধরণের ব্যাকটেরিয়া। এই ব্যাকটেরিয়ার জিন বেগুনে প্রবেশ করিয়ে পোকা প্রতিরোধী Bt বেগুন তৈরি করা হয়েছে।


১৬। মানুষের ইনসুলিন উৎপাদনকারী জিনটি কোন ক্রোমোজোমে অবস্থিত?

ক) ১ নং
খ) ১১ নং
গ) ২১ নং
ঘ) X ক্রোমোজোম

সঠিক উত্তর: খ) ১১ নং

ব্যাখ্যা: মানুষের ইনসুলিন তৈরির সংকেত বহনকারী জিনটি ১১ নং ক্রোমোজোমের ছোট বাহুতে অবস্থিত।


১৭। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভেড়ার দুধে কোন প্রোটিন পাওয়া গেছে?

ক) কেসিন
খ) অ্যালবুমিন
গ) আলফা-১ অ্যান্টিট্রিপসিন
ঘ) গ্লোবিউলিন

সঠিক উত্তর: গ) আলফা-১ অ্যান্টিট্রিপসিন

ব্যাখ্যা: ট্রান্সজেনিক ভেড়ার দুধে আলফা-১ অ্যান্টিট্রিপসিন নামক প্রোটিন পাওয়া যায় যা এমফাইসিমা (ফুসফুসের রোগ) চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।


১৮। tPA (Tissue Plasminogen Activator) কী কাজে লাগে?

ক) রক্ত জমাট বাঁধতে
খ) স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকের পর রক্ত জমাট গলাতে
গ) রক্তচাপ বাড়াতে
ঘ) রক্তে গ্লুকোজ কমাতে

সঠিক উত্তর: খ) স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকের পর রক্ত জমাট গলাতে

ব্যাখ্যা: tPA একটি এনজাইম যা রক্তনালীর ভেতরে জমাট বাঁধা রক্ত (blood clot) গলিয়ে দিতে সাহায্য করে, যা হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক রোগীদের জীবন বাঁচাতে জরুরি।


নিচের উদ্দীপকটি পড় এবং ১৯ ও ২০ নং প্রশ্নের উত্তর দাও:

একজন গবেষক ল্যাবরেটরিতে একটি ধানের জাত উন্নত করার চেষ্টা করছেন। তিনি এই ধানে ড্যাফোডিল ফুল থেকে বিটা-ক্যারোটিন তৈরির জিন প্রবেশ করালেন। ফলে ধানটি হলুদ বর্ণ ধারণ করল।

১৯। গবেষক কোন প্রযুক্তিটি ব্যবহার করেছেন?

ক) টিস্যু কালচার
খ) ক্লোনিং
গ) রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ প্রযুক্তি
ঘ) হাইব্রিডাইজেশন

সঠিক উত্তর: গ) রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ প্রযুক্তি

ব্যাখ্যা: এক জীবের (ড্যাফোডিল) জিন অন্য জীবে (ধান) স্থানান্তর করার প্রক্রিয়াটি হলো রিকম্বিনেন্ট ডিএনএ প্রযুক্তি বা জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং।


২০। উৎপাদিত ধানটি খেলে মানুষের কোন সমস্যা দূর হতে পারে?

ক) রাতকানা
খ) রিকেটস
গ) স্কার্ভি
ঘ) বেরিবেরি

সঠিক উত্তর: ক) রাতকানা

ব্যাখ্যা: এই ধানটি 'গোল্ডেন রাইস' নামে পরিচিত। এতে বিটা-ক্যারোটিন থাকে যা শরীরে ভিটামিন-এ তৈরি করে। ভিটামিন-এ এর অভাবে রাতকানা রোগ হয়, তাই এটি রাতকানা প্রতিরোধে সহায়ক।


২১। ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা অপরাধী শনাক্তকরণে ডিএনএর কোন বৈশিষ্ট্য কাজে লাগানো হয়?

ক) ডিএনএর দৈর্ঘ্য
খ) ডিএনএর নির্দিষ্ট সিকোয়েন্সের অনন্যতা
গ) ডিএনএর রঙ
ঘ) ডিএনএর ওজন

সঠিক উত্তর: খ) ডিএনএর নির্দিষ্ট সিকোয়েন্সের অনন্যতা

ব্যাখ্যা: প্রত্যেক মানুষের ডিএনএ সিকোয়েন্স বা বিন্যাস (বিশেষ করে কিছু নির্দিষ্ট অংশ) অনন্য বা ইউনিক। এই বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করেই ডিএনএ ফিঙ্গারপ্রিন্টিং করা হয়।


২২। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে 'ক্লোনিং' বলতে কী বোঝায়?

ক) হুবহু একই জিন বা জীবের প্রতিলিপি তৈরি করা
খ) ভিন্ন প্রজাতির জীব তৈরি করা
গ) কৃত্রিম অঙ্গ তৈরি করা
ঘ) রোবট তৈরি করা

সঠিক উত্তর: ক) হুবহু একই জিন বা জীবের প্রতিলিপি তৈরি করা

ব্যাখ্যা: ক্লোনিং হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে কোনো জিন, কোষ বা সম্পূর্ণ জীবের হুবহু একই রকম প্রতিলিপি (Copy) তৈরি করা হয়।


নিচের উদ্দীপকটি পড় এবং ২৩ ও ২৪ নং প্রশ্নের উত্তর দাও:

রহিম সাহেব তার জমিতে এমন এক ধরণের তুলা চাষ করলেন যা পোকা আক্রমণ করতে পারে না। তিনি জানলেন যে, এই তুলার বীজে একটি বিশেষ ব্যাকটেরিয়ার বিষাক্ত প্রোটিন তৈরির জিন যুক্ত করা হয়েছে।

২৩। রহিম সাহেবের চাষ করা তুলাটি কী নামে পরিচিত?

ক) হাইব্রিড তুলা
খ) Bt তুলা
গ) অর্গানিক তুলা
ঘ) সুপার কটন

সঠিক উত্তর: খ) Bt তুলা

ব্যাখ্যা: Bacillus thuringiensis (Bt) ব্যাকটেরিয়ার জিন যুক্ত করে যে তুলা তৈরি করা হয় তাকে Bt কটন বা Bt তুলা বলে। এটি পোকা প্রতিরোধী।


২৪। উক্ত তুলা চাষের ফলে—
i. উৎপাদন খরচ কমবে
ii. পরিবেশ দূষণ কমবে
iii. দেশীয় তুলার জাত বিলুপ্ত হতে পারে

নিচের কোনটি সঠিক?
ক) i ও ii
খ) i ও iii
গ) ii ও iii
ঘ) i, ii ও iii

সঠিক উত্তর: ঘ) i, ii ও iii

ব্যাখ্যা: কীটনাশক কম লাগায় খরচ ও দূষণ কমে (i ও ii)। তবে বিদেশি এই শক্তিশালী জাতের প্রভাবে দেশীয় দুর্বল জাতগুলো প্রতিযোগিতায় টিকে না থেকে হারিয়ে যেতে পারে (iii)।


২৫। মানুষের জিনোম সিকোয়েন্স জানার প্রকল্পটির নাম কী?

ক) Human DNA Project
খ) Human Genome Project (HGP)
গ) Gene Mapping Mission
ঘ) Genome Sequencing Org

সঠিক উত্তর: খ) Human Genome Project (HGP)

ব্যাখ্যা: হিউম্যান জিনোম প্রজেক্ট (HGP) হলো একটি আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রকল্প যার লক্ষ্য ছিল মানুষের ডিএনএ-র সম্পূর্ণ সিকোয়েন্স বা নকশা বের করা।