ইনপুট ডিভাইস: মানুষ কীভাবে কম্পিউটারের সাথে কথা বলে
কীবোর্ড, মাউস থেকে শুরু করে বায়োমেট্রিক, সেন্সর ও টাচস্ক্রিনসহ আধুনিক কম্পিউটারের বিভিন্ন ইনপুট ডিভাইস সম্পর্কে বিস্তারিত।
ইনপুট ডিভাইস: মানুষ কীভাবে কম্পিউটারের সাথে কথা বলে
- ইনপুট ডিভাইস: মানুষ কীভাবে কম্পিউটারের সাথে কথা বলে
- যন্ত্ররা কীভাবে আমাদের ভাষা বোঝে?
- ইনপুট ডিভাইসের ভূমিকা ও GIGO নীতি
- ঐতিহ্যবাহী ইনপুট: কীবোর্ড
- পয়েন্টিং ডিভাইস ও স্মার্ট নেভিগেশন
- টাচস্ক্রিন প্রযুক্তি: আঙুলের ছোঁয়ায় ইনপুট
- মাল্টি-টাচ জেসচার এবং স্টাইলাস
- শব্দ ও দৃশ্যের ইনপুট: অডিও এবং ভিজ্যুয়াল
- স্ক্যানার এবং কোড রিডার
- বায়োমেট্রিক্স: যখন শরীরই ইনপুট ডিভাইস
- সেন্সর: চারপাশের পরিবেশ বোঝার প্রযুক্তি
- ভবিষ্যতের ইনপুট: ইমার্জিং প্রযুক্তি
- সারসংক্ষেপ: আজ আমরা কী শিখলাম?
ইনপুট ডিভাইস: মানুষ কীভাবে কম্পিউটারের সাথে কথা বলে
মানুষ যেভাবে একে অপরের সাথে কথা বলে বা নিজের মনের ভাব প্রকাশ করে, কম্পিউটারের সাথে সেভাবে সরাসরি কথা বলা যায় না। মানুষের ভাষা হলো বাংলা, ইংরেজি বা অন্য কোনো প্রচলিত ভাষা, কিন্তু কম্পিউটার শুধুমাত্র বৈদ্যুতিক সংকেতের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি বুঝতে পারে, যাকে আমরা বাইনারি সংখ্যা $0$ (অফ) এবং $1$ (অন) হিসেবে চিনি। এই ভাষাগত পার্থক্যের কারণে আমাদের এমন এক ধরনের মধ্যস্থতাকারী মাধ্যমের প্রয়োজন হয়, যা মানুষের দেওয়া নির্দেশকে কম্পিউটারের বোধগম্য ভাষায় রূপান্তর করতে পারে। এই কাজটিই করে থাকে ইনপুট ডিভাইস।
সংজ্ঞা (Definition): ইনপুট ডিভাইস (Input Device) — যেসব হার্ডওয়্যার যন্ত্রপাতির সাহায্যে ব্যবহারকারী কম্পিউটারে ডেটা (Data) বা নির্দেশাবলি (Instructions) প্রদান করে এবং যা মানুষের বোধগম্য ডেটাকে কম্পিউটারের বোধগম্য ডিজিটাল সিগন্যালে ($0$ এবং $1$) রূপান্তর করে, তাদেরকে ইনপুট ডিভাইস বলা হয়।
কম্পিউটারের কাজের মূল ভিত্তি হলো ইনফরমেশন প্রসেসিং সাইকেল বা তথ্য প্রক্রিয়াকরণ চক্র। এই চক্রটি মূলত চারটি ধাপে কাজ করে: ইনপুট (Input), প্রসেস (Process), আউটপুট (Output) এবং স্টোরেজ (Storage)। ইনপুট ডিভাইসের মাধ্যমেই এই চক্রের সূচনা ঘটে। ব্যবহারকারী কীবোর্ড বা মাউসের মাধ্যমে যে কাঁচা তথ্য বা 'ডেটা' প্রদান করেন, সেটি প্রসেসরের কাছে যায়। প্রসেসর বা CPU সেই ডেটাকে বিশ্লেষণ করে মানুষের ব্যবহারযোগ্য 'ইনফরমেশন' বা ফলাফলে পরিণত করে, যা আমরা আউটপুট ডিভাইসের (যেমন- মনিটর) মাধ্যমে দেখতে পাই।
এই তথ্য প্রক্রিয়াকরণ চক্রে ইনপুটের সঠিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কম্পিউটারের নিজের কোনো চিন্তাশক্তি নেই, সে কেবল ব্যবহারকারীর দেওয়া নির্দেশ হুবহু পালন করে। এখানেই 'GIGO' নীতির বিষয়টি সামনে আসে।
সংজ্ঞা (Definition): GIGO (Garbage In, Garbage Out) — এটি কম্পিউটার বিজ্ঞানের একটি মৌলিক নীতি। এর অর্থ হলো, কম্পিউটারে যদি ভুল বা ত্রুটিপূর্ণ ডেটা (Garbage) ইনপুট হিসেবে প্রদান করা হয়, তবে সিপিইউ (CPU) সেই ভুল ডেটা প্রসেস করবে এবং চূড়ান্ত আউটপুট বা ফলাফলও অকেজো বা ত্রুটিপূর্ণ (Garbage) হবে।
অর্থাৎ, একটি কম্পিউটার সিস্টেম থেকে সঠিক ফলাফল বা আউটপুট পাওয়ার পূর্বশর্ত হলো সঠিক ইনপুট ডিভাইস ব্যবহার করে নির্ভুল ডেটা প্রদান করা।
সাধারণ ইনপুট ডিভাইস: কীবোর্ড ও পয়েন্টিং ডিভাইস
কম্পিউটারের সাথে মানুষের যোগাযোগের সবচেয়ে প্রাথমিক এবং বহুল ব্যবহৃত মাধ্যম হলো কীবোর্ড এবং মাউস। এই দুটি ডিভাইস ছাড়া একটি আধুনিক ডেস্কটপ বা ল্যাপটপ কম্পিউটারের কথা কল্পনাই করা যায় না।
কীবোর্ড মূলত টাইপরাইটারের উন্নত সংস্করণ। বর্তমান সময়ে সারা বিশ্বে 'QWERTY' লেআউট বা বিন্যাসযুক্ত কীবোর্ড সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। একটি আদর্শ কীবোর্ডের কী বা বোতামগুলোকে তাদের কাজের ধরন অনুযায়ী কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়:
১. Alphanumeric Keys: ইংরেজি বর্ণমালা (A-Z) এবং সংখ্যা (0-9) সম্বলিত কীগুলো, যা মূলত লেখালেখির কাজে ব্যবহৃত হয়।
২. Function Keys: কীবোর্ডের একদম উপরের সারিতে F1 থেকে F12 পর্যন্ত ১২টি কী থাকে। এগুলো বিভিন্ন সফটওয়্যারে নির্দিষ্ট বা শর্টকাট কাজের জন্য ব্যবহৃত হয়।
৩. Navigation Keys: কার্সরকে ডানে-বামে বা উপরে-নিচে সরানোর জন্য অ্যারো (Arrow) কী, Home, End, Page Up, Page Down ইত্যাদি।
৪. Modifier Keys: Shift, Ctrl, Alt ইত্যাদি কী।
গুরুত্বপূর্ণ (Important):
- মডিফায়ার কী (Modifier Keys): কীবোর্ডের 'Modifier Keys' (Shift, Ctrl, Alt) একা কোনো কাজ করতে পারে না। কিন্তু অন্য কোনো কীর সাথে যুক্ত হয়ে এরা বিশেষ নির্দেশ প্রদান করে। যেমন, Ctrl + C চাপলে লেখা কপি হয়। দ্রুত ডেটা এন্ট্রির কাজে এই কীগুলোর ব্যবহার অপরিহার্য।
- ফাংশন কী (Function Keys): বিভিন্ন প্রোগ্রামে দ্রুত কাজ করতে এগুলো ব্যবহৃত হয়। যেমন, যেকোনো উইন্ডোজে সাহায্য বা Help মেনু আনতে F1 এবং ব্রাউজার বা পেজ রিফ্রেশ করতে F5 ব্যবহৃত হয়।
কীবোর্ডের পাশাপাশি আরেকটি অপরিহার্য ইনপুট ডিভাইস হলো মাউস। গ্রাফিক্যাল ইউজার ইন্টারফেস (GUI) বা ছবিভিত্তিক অপারেটিং সিস্টেমের (যেমন- উইন্ডোজ) বিকাশের সাথে সাথে মাউসের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। মাউসের সাহায্যে স্ক্রিনের উপর একটি পয়েন্টার বা তীরচিহ্ন নিয়ন্ত্রণ করা যায় বলে একে 'পয়েন্টিং ডিভাইস' (Pointing Device) বলা হয়।
প্রথম দিকের মাউসগুলোতে নিচে একটি রাবারের বল থাকত, যাকে মেকানিক্যাল মাউস বলা হতো। কিন্তু বর্তমান যুগে অপটিক্যাল মাউস (Optical Mouse) ব্যবহৃত হয়। অপটিক্যাল মাউসে কোনো বল থাকে না; বরং এর নিচে একটি ছোট LED লাইট এবং সেন্সর বা ক্যামেরা থাকে। মাউসটিকে যখন কোনো তলের ওপর নাড়ানো হয়, সেন্সরটি আলোর প্রতিফলনের পরিবর্তন হিসাব করে স্ক্রিনের পয়েন্টারটিকে সেই অনুযায়ী দিকনির্দেশ পাঠায়।
পরীক্ষার টিপস (Exam Tip): পরীক্ষায় প্রায়ই "মাউসকে কেন পয়েন্টিং ডিভাইস বলা হয়?" প্রশ্নটি আসে। এর উত্তরে লিখবেন: "মাউস ব্যবহার করে কম্পিউটারের মনিটরে প্রদর্শিত যেকোনো আইকন, মেনু বা ফাইলের ওপর কার্সর পয়েন্ট বা নির্দেশ করা যায় এবং ক্লিক করে কমান্ড দেওয়া যায় বলে একে পয়েন্টিং ডিভাইস বলা হয়।"
অপটিক্যাল এবং কোড রিডার: স্ক্যানার, বারকোড ও QR কোড
সাধারণ ডেটা টাইপ করার বাইরে যখন আমাদের কোনো ছবি, প্রিন্ট করা ডকুমেন্ট বা ফর্ম সরাসরি কম্পিউটারে প্রবেশ করাতে হয়, তখন আমরা অপটিক্যাল ইনপুট ডিভাইস ব্যবহার করি। এই ডিভাইসগুলো আলো বা অপটিক্যাল সেন্সরের মাধ্যমে কাজ করে।
সবচেয়ে পরিচিত অপটিক্যাল ডিভাইস হলো স্ক্যানার (Scanner)। একটি ফ্ল্যাটবেড স্ক্যানার কাগজের ওপর থাকা যেকোনো ছবি বা লেখাকে স্ক্যান করে তাকে ডিজিটাল ইমেজে রূপান্তর করে। এর ফলে কাগজের হার্ডকপি সরাসরি কম্পিউটারের সফটকপিতে পরিণত হয়। তবে স্ক্যানার ছাড়াও আরও কিছু বিশেষায়িত অপটিক্যাল ডিভাইস আছে, যা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ:
সংজ্ঞা (Definition): OMR (Optical Mark Recognition) — এটি এমন একটি ইনপুট ডিভাইস যা কাগজে পেন্সিল বা কালির বিশেষ দাগ বা বৃত্ত শনাক্ত করতে পারে। বহুনির্বাচনী প্রশ্নের (MCQ) উত্তরপত্র এবং বিভিন্ন জরিপের ফর্ম দ্রুত ও নির্ভুলভাবে মূল্যায়নে এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
OMR ছাড়াও রয়েছে OCR (Optical Character Recognition), যা শুধুমাত্র ছবি স্ক্যান করে না, বরং ছবির ভেতরের অক্ষরগুলোকে চিনে সেগুলোকে সম্পাদনাযোগ্য (Editable) টেক্সটে রূপান্তর করে। এর ফলে কোনো স্ক্যান করা ডকুমেন্টের লেখা খুব সহজেই পরিবর্তন বা পরিমার্জন করা যায়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ডিভাইস হলো MICR (Magnetic Ink Character Recognition)। ব্যাংকের চেক বইয়ের নিচে বিশেষ এক ধরনের চুম্বকীয় কালি দিয়ে রাউটিং নম্বর ও অ্যাকাউন্ট নম্বর লেখা থাকে। MICR মেশিন সেই কালির লেখাকে পড়ে খুব দ্রুত এবং নিরাপদে চেক প্রসেস করতে সাহায্য করে।
বর্তমান সময়ে কেনাকাটা বা লেনদেনের ক্ষেত্রে বারকোড এবং QR কোডের ব্যবহার আমরা প্রতিনিয়তই দেখছি। এরা মূলত পণ্যের বা তথ্যের গায়ে লাগানো এক ধরনের অপটিক্যাল লেবেল, যা স্ক্যানার দিয়ে পড়তে হয়।
বারকোড হলো বিভিন্ন পুরুত্বের সমান্তরাল কালো রেখার একটি বিন্যাস। এটি সাধারণত সুপারশপে বা বিভিন্ন পণ্যের মোড়কে দেখা যায়। অন্যদিকে, QR কোড হলো চারকোনা পিক্সেলের একটি আধুনিক বিন্যাস।
গুরুত্বপূর্ণ (Important):
বারকোড এবং QR (Quick Response) কোডের মধ্যে মূল পার্থক্যগুলো হলো:
- মাত্রিকতা: বারকোড হলো একমাত্রিক (1D) যা শুধু সমান্তরাল রেখা দিয়ে গঠিত। অন্যদিকে QR কোড দ্বিমাত্রিক (2D) এবং বর্গাকৃতির পিক্সেল বা ছক দিয়ে গঠিত।
- ডেটা ধারণক্ষমতা: বারকোডের ডেটা ধারণক্ষমতা অনেক কম (সাধারণত কিছু নম্বর বা অক্ষর)। কিন্তু QR কোডে কয়েক হাজার আলফানিউমেরিক ক্যারেক্টার, ওয়েবলিংক বা কন্টাক্ট ইনফরমেশন সেভ করে রাখা যায়।
- ব্যবহার: বারকোড সাধারণত সুপারশপে পণ্যের দাম বা সিরিয়াল নম্বর স্ক্যান করতে ব্যবহৃত হয়। QR কোড ডিজিটাল পেমেন্ট (বিকাশ/নগদ), ওয়েবসাইট লিংকিং এবং টিকিটিংয়ে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
টাচস্ক্রিন প্রযুক্তি: আঙুলের ছোঁয়ায় ইনপুট
স্মার্টফোন এবং ট্যাবলেটের যুগে সবচেয়ে জনপ্রিয় ইনপুট মাধ্যম হলো টাচস্ক্রিন (Touchscreen)। টাচস্ক্রিনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি একই সাথে ইনপুট এবং আউটপুট ডিভাইস হিসেবে কাজ করে। ব্যবহারকারী সরাসরি স্ক্রিনের ওপর আঙুল ছুঁইয়ে নির্দেশ দেন (ইনপুট) এবং সেখানেই কাজের ফলাফল দেখতে পান (আউটপুট)।
টাচস্ক্রিন প্রযুক্তি মূলত দুই ধরনের হয়ে থাকে: রেজিস্টিভ (Resistive) এবং ক্যাপাসিটিভ (Capacitive)।
রেজিস্টিভ টাচস্ক্রিনে পরপর দুটি পাতলা স্বচ্ছ স্তর থাকে। যখন ব্যবহারকারী স্ক্রিনে চাপ দেন, তখন ওপরের স্তরটি বেঁকে গিয়ে নিচের স্তরের সাথে লেগে যায় এবং বৈদ্যুতিক সংযোগ তৈরি হয়। ডিভাইসটি তখন বুঝতে পারে ঠিক কোথায় চাপ দেওয়া হয়েছে। পুরনো দিনের স্মার্টফোন বা এটিএম বুথের স্ক্রিনে এই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হতো, যেখানে কাজ করার জন্য কিছুটা জোরে চাপ দিতে হতো।
কিন্তু আধুনিক স্মার্টফোনে ক্যাপাসিটিভ টাচস্ক্রিন ব্যবহার করা হয়।
সংজ্ঞা (Definition): Capacitive Touchscreen — যে টাচস্ক্রিন প্রযুক্তি মানবদেহের প্রাকৃতিক স্থিরবিদ্যুৎ (Static Electricity) বা বিদ্যুৎ পরিবাহিতা ব্যবহার করে স্পর্শ শনাক্ত করে, তাকে ক্যাপাসিটিভ টাচস্ক্রিন বলে।
ক্যাপাসিটিভ স্ক্রিনে কোনো চাপ দেওয়ার প্রয়োজন হয় না, আঙুলের সামান্য ছোঁয়াতেই এটি কাজ করে। এটি একই সাথে একাধিক আঙুলের স্পর্শ বা 'মাল্টি-টাচ' (Pinch to zoom, Swipe) বুঝতে পারে।
পরীক্ষার টিপস (Exam Tip): পরীক্ষায় প্রায়ই একটি প্রয়োগমূলক প্রশ্ন আসতে পারে: "শীতকালে উলের গ্লাভস পরে আধুনিক স্মার্টফোন চালানো যায় না কেন?"
এর উত্তর হলো: আধুনিক স্মার্টফোনে ক্যাপাসিটিভ টাচ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়, যা কাজ করার জন্য আঙুলের বিদ্যুৎ পরিবাহিতা প্রয়োজন হয়। উলের বা চামড়ার গ্লাভস বিদ্যুৎ অপরিবাহী হওয়ায়, গ্লাভস পরলে আঙুলের বিদ্যুৎ স্ক্রিন পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। ফলে স্ক্রিন স্পর্শ শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়।
বায়োমেট্রিক্স: যখন শরীরই ইনপুট ডিভাইস
প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে ডেটা নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পাসওয়ার্ড বা পিন নম্বর ভুলে যাওয়ার বা চুরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এর সর্বাধুনিক সমাধানে এসেছে বায়োমেট্রিক ইনপুট ডিভাইস, যেখানে মানুষের শরীরকেই পাসওয়ার্ড হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
সংজ্ঞা (Definition): Biometrics (বায়োমেট্রিক্স) — এটি এমন একটি প্রযুক্তি বা বিজ্ঞান, যার সাহায্যে মানুষের অদ্বিতীয় শারীরিক বা আচরণগত বৈশিষ্ট্য (যেমন: আঙুলের ছাপ, চোখের রেটিনা বা আইরিস, কণ্ঠস্বর বা মুখমণ্ডল ইত্যাদি) মেপে এবং বিশ্লেষণ করে কোনো ব্যক্তিকে অকাট্যভাবে শনাক্ত করা হয়।
বায়োমেট্রিক ডিভাইস মানুষের শারীরিক বৈশিষ্ট্যকে ডিজিটাল ডেটায় বা টেমপ্লেটে রূপান্তর করে কম্পিউটারে সংরক্ষণ করে। পরবর্তীতে যখন সেই ব্যক্তি আবার আসেন, তখন তার বর্তমান ডেটার সাথে সংরক্ষিত ডেটা মিলিয়ে দেখা হয় (Matching)।
বায়োমেট্রিক্সের প্রধান ধরনগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- ফিঙ্গারপ্রিন্ট রিডার (Fingerprint Reader): আঙুলের ছাপের রেখা বা প্যাটার্ন স্ক্যান করে।
- আইরিস স্ক্যানার (Iris Scanner): চোখের মণির রঙিন অংশ বা আইরিসের অদ্বিতীয় বিন্যাস শনাক্ত করে।
- ফেস রিকগনিশন (Face Recognition): মানুষের মুখমণ্ডলের জ্যামিতিক মাপ (চোখ, নাক ও ঠোঁটের দূরত্ব) বিশ্লেষণ করে।
উদাহরণ (Example):
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বায়োমেট্রিক্সের সবচেয়ে সফল প্রয়োগ হলো 'স্মার্ট ন্যাশনাল আইডি কার্ড (NID)' প্রকল্প এবং 'সিম রেজিস্ট্রেশন'। স্মার্ট কার্ড তৈরির সময় নাগরিকদের ১০ আঙুলের ছাপ (Fingerprint) এবং চোখের আইরিস (Iris) ইনপুট হিসেবে ডেটাবেসে সংরক্ষণ করা হয়েছে। বর্তমানে মোবাইল সিম কিনতে গেলে গ্রাহককে তার আঙুলের ছাপ দিতে হয়, যা সরাসরি জাতীয় ডেটাবেসের সাথে মিলিয়ে দেখা হয়। এটি জালিয়াতি এবং অপরাধ দমনে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।
সেন্সর এবং ভবিষ্যতের ইনপুট প্রযুক্তি
আগে যেকোনো ইনপুট দেওয়ার জন্য মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণের প্রয়োজন হতো (যেমন- বোতাম চাপা বা কথা বলা)। কিন্তু আধুনিক স্মার্ট ডিভাইসে এমন কিছু স্বয়ংক্রিয় ইনপুট ডিভাইস থাকে, যা পরিবেশ থেকে নিজে নিজেই ডেটা সংগ্রহ করে। এদেরকে সেন্সর (Sensor) বলা হয়।
স্মার্টফোনের দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেন্সর হলো জাইরোস্কোপ এবং প্রক্সিমিটি সেন্সর।
গুরুত্বপূর্ণ (Important):
- প্রক্সিমিটি সেন্সর (Proximity Sensor): এটি কোনো বস্তুর উপস্থিতি বা দূরত্ব মাপতে পারে। ফোনে কথা বলার সময় ফোনটি যখন কানের কাছে নেওয়া হয়, তখন এই সেন্সর তা বুঝতে পেরে অটোমেটিক স্ক্রিনের আলো বন্ধ করে দেয়, যাতে ভুলে অন্য কোনো বোতামে চাপ না লাগে।
- জাইরোস্কোপ (Gyroscope): এই সেন্সর ডিভাইসের কৌণিক অবস্থান (Rotation/Orientation) নির্ণয় করে। আপনি ফোনটি ল্যান্ডস্কেপ মোডে ঘুরালে যে স্ক্রিনটি অটো-রোটেট হয়ে যায় বা রেসিং গেম খেলার সময় ফোন বাঁকা করে গাড়ি ঘোরানো যায়, তা এই সেন্সরের দেওয়া ইনপুটের কারণেই সম্ভব হয়।
ভবিষ্যতের ইনপুট প্রযুক্তি আরও বিস্ময়কর হতে চলেছে। এর একটি বড় উদাহরণ হলো ব্রেইন-কম্পিউটার ইন্টারফেস (BCI) বা নিউরালিংকের মতো প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তিতে মানুষের মস্তিষ্কে ছোট চিপ বসিয়ে দেওয়া হয়। ফলে ব্যবহারকারীকে কোনো কীবোর্ড বা মাউস ধরতে হয় না, তিনি শুধু মনে মনে চিন্তা করেন (Thoughts) এবং সেই চিন্তার সিগন্যালগুলো সরাসরি কম্পিউটারের ইনপুটে পরিণত হয়ে স্ক্রিনে কাজ সম্পন্ন হয়। বিশেষ করে শারীরিকভাবে অক্ষম বা প্যারালাইজড রোগীদের জন্য এটি একটি যুগান্তকারী আশীর্বাদ।
সংক্ষিপ্ত সারাংশ (Quick Revision):
- ইনপুট ডিভাইসের কাজ: মানুষের বোধগম্য নির্দেশকে কম্পিউটারের জন্য বাইনারি বা ডিজিটাল ($0$ এবং $1$) সংকেতে রূপান্তর করা।
- GIGO নীতি: 'Garbage In, Garbage Out' প্রমাণ করে যে, সঠিক প্রসেসিং এবং আউটপুটের জন্য নির্ভুল ইনপুট আবশ্যক।
- কীবোর্ড ও মাউস: কীবোর্ড (QWERTY) এবং মাউস সর্বাধিক ব্যবহৃত সাধারণ ইনপুট। মাউসকে বলা হয় পয়েন্টিং ডিভাইস।
- অপটিক্যাল রিডার: OMR (বৃত্ত ভরাট পড়া), OCR (ছবি থেকে টেক্সট আলাদা করা) এবং MICR (ব্যাংকের চেক পড়া) ডাটা এন্ট্রির কাজকে দ্রুত ও নির্ভুল করে।
- টাচস্ক্রিন: ক্যাপাসিটিভ টাচস্ক্রিন মানুষের শরীরের স্থিরবিদ্যুত পরিবাহিতার সাহায্যে কাজ করে এবং রেজিস্টিভ টাচস্ক্রিন চাপের সাহায্যে কাজ করে।
- বারকোড বনাম QR কোড: বারকোড একমাত্রিক (1D) প্রযুক্তি এবং QR কোড দ্বিমাত্রিক (2D) প্রযুক্তি, যার ডেটা ধারণক্ষমতা অনেক বেশি।
- বায়োমেট্রিক্স: মানুষের অদ্বিতীয় শারীরিক বৈশিষ্ট্য (ফিঙ্গারপ্রিন্ট, আইরিস) পরিমাপ করে নিখুঁত নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
পরিভাষা (Terminology Glossary)
| Term (শব্দ) | Definition (সংজ্ঞা) |
|---|---|
| Input Device (ইনপুট ডিভাইস) | যেসব হার্ডওয়্যার যন্ত্র ব্যবহার করে কম্পিউটারে ডেটা ও নির্দেশ প্রদান করা হয়। |
| GIGO (গাইগো) | Garbage In, Garbage Out - ভুল ডেটা ইনপুট দিলে ভুল ফলাফল আসার নীতি। |
| QWERTY (কোয়ার্টি) | কীবোর্ডের অক্ষরের সবচেয়ে প্রচলিত ইংরেজি লেআউট বা বিন্যাস পদ্ধতি। |
| OMR (ওএমআর) | Optical Mark Recognition - কাগজে পেন্সিল বা কালির দাগ পড়ার অপটিক্যাল যন্ত্র। |
| OCR (ওসিআর) | Optical Character Recognition - স্ক্যান করা ছবি থেকে টেক্সট আলাদা করার প্রযুক্তি। |
| Capacitive Touch (ক্যাপাসিটিভ টাচ) | মানুষের শরীরের স্থিরবিদ্যুৎ পরিবাহিতা দিয়ে কাজ করা আধুনিক টাচস্ক্রিন প্রযুক্তি। |
| Biometrics (বায়োমেট্রিক্স) | মানুষের শারীরিক বা আচরণগত বৈশিষ্ট্যের সাহায্যে ব্যক্তি শনাক্তকরণ প্রযুক্তি। |