ডেটা ও ইনফরমেশন: আইসিটির কাঁচামাল
ডেটা কী এবং ইনফরমেশন কী? এদের মধ্যে পার্থক্য এবং আইসিটির কাঁচামাল হিসেবে কীভাবে ডেটা প্রসেস হয়ে ইনফরমেশনে পরিণত হয় তা বিস্তারিত জানুন।
ডেটা ও ইনফরমেশন: আইসিটির কাঁচামাল
- ডেটা ও ইনফরমেশন: আইসিটির কাঁচামাল
- একটু ভাবি...
- ডেটা (Data) কী?
- ডেটার প্রকারভেদ: নিউমেরিক এবং টেক্সট
- ডেটার প্রকারভেদ: মাল্টিমিডিয়া ডেটা
- ইনফরমেশন (Information) কী?
- ডেটা বনাম ইনফরমেশন
- ভালো ইনফরমেশনের বৈশিষ্ট্য
- ডেটা থেকে ইনফরমেশনের রূপান্তর
- সিদ্ধান্ত গ্রহণে ইনফরমেশনের গুরুত্ব
- ডেটা, ইনফরমেশন এবং জ্ঞান (Knowledge)
- সারসংক্ষেপ ও পরবর্তী পাঠ
ডেটা ও ইনফরমেশন: আইসিটির কাঁচামাল
যেকোনো উৎপাদনমুখী কারখানার দিকে লক্ষ করলে দেখা যায়, সেখানে একটি নির্দিষ্ট কাঁচামাল বা 'Raw Material' ব্যবহার করে যন্ত্রপাতির মাধ্যমে চূড়ান্ত বা ফিনিশড পণ্য তৈরি করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, একটি পোশাক কারখানায় তুলা বা সুতা হলো প্রাথমিক কাঁচামাল। এই তুলাকে যখন বিভিন্ন মেশিনের সাহায্যে প্রক্রিয়াজাত করা হয়, তখন তা থেকে তৈরি হয় পরিধানযোগ্য সুন্দর পোশাক। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির (ICT) জগতেও ঠিক একই রকম একটি প্রক্রিয়া অবিরাম চলছে। আইসিটির মূল কাজই হলো ব্যবহারকারীর প্রয়োজনীয় এবং অর্থপূর্ণ চূড়ান্ত ফলাফল তৈরি করা, যার জন্য এরও কিছু প্রাথমিক কাঁচামালের প্রয়োজন হয়। আইসিটি বা কম্পিউটার সিস্টেমের এই অপরিহার্য কাঁচামালটিকেই আমরা 'ডেটা' বা উপাত্ত বলে থাকি।
কম্পিউটার নিজে থেকে কোনো কিছু তৈরি বা চিন্তা করতে পারে না। এটি মূলত মানুষের দেওয়া কাঁচামাল বা ডেটা গ্রহণ করে এবং সেগুলোকে প্রক্রিয়াজাত বা প্রসেস করে ব্যবহারযোগ্য ইনফরমেশন বা তথ্য প্রদান করে। আধুনিক ডিজিটাল যুগে আমাদের চারপাশে যা কিছু ঘটছে, তার সবই কোনো না কোনোভাবে ডেটা তৈরি করছে। একটি সাধারণ স্মার্টফোন থেকে শুরু করে বিশাল কৃত্রিম উপগ্রহ—সবকিছুই অবিরাম ডেটা সংগ্রহ এবং সেটি বিশ্লেষণ করে ইনফরমেশন তৈরির কাজে নিয়োজিত। তাই আইসিটি সম্পর্কে গভীরভাবে জানার পূর্বে এর মূল ভিত্তি তথা ডেটা এবং ইনফরমেশন সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরি।
ডেটা (Data) বা উপাত্ত: পরিচিতি ও প্রকারভেদ
ল্যাটিন শব্দ 'Datum' থেকে 'Data' শব্দটির উৎপত্তি ঘটেছে। 'Datum' শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো 'Fact' বা তথ্যের একক উপাদান। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ বিভিন্ন হিসাব-নিকাশ বা ঘটনা মনে রাখার জন্য যেসব চিহ্ন বা সংখ্যা ব্যবহার করত, সেগুলোই ছিল ডেটার আদি রূপ। বর্তমান কম্পিউটার বিজ্ঞানে ডেটা বলতে সেই সব অগোছালো, অসংগঠিত এবং বিচ্ছিন্ন ফ্যাক্টগুলোকে বোঝায়, যা প্রক্রিয়াকরণের জন্য ইনপুট হিসেবে কম্পিউটারে প্রবেশ করানো হয়। এটি হতে পারে কোনো সংখ্যা, অক্ষর, শব্দ, ছবি বা অডিও।
সংজ্ঞা (Definition): ল্যাটিন শব্দ 'Datum' এর বহুবচন হলো 'Data', যার অর্থ হলো 'Fact' বা তথ্যের উপাদান। সুনির্দিষ্ট ফলাফল বা আউটপুট পাওয়ার জন্য প্রসেসিং বা প্রক্রিয়াকরণের কাজে ব্যবহৃত অসংগঠিত কাঁচামালসমূহকে ডেটা বা উপাত্ত বলে। সহজ কথায়, তথ্যের ক্ষুদ্রতম একক বা অসংগঠিত ফ্যাক্ট-ই হলো ডেটা।
কম্পিউটার সিস্টেমে ইনপুট হিসেবে ব্যবহৃত ডেটাকে তাদের ধরন ও বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে প্রধানত কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। নিচে ডেটার প্রধান প্রকারভেদগুলো আলোচনা করা হলো:
- নিউমেরিক ডেটা (Numeric Data): যে ধরনের ডেটা শুধুমাত্র সংখ্যা বা অঙ্ক দ্বারা গঠিত হয়, তাকে নিউমেরিক ডেটা বলে। এই ধরনের ডেটার উপর বিভিন্ন গাণিতিক প্রক্রিয়া (যেমন: যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ) সরাসরি প্রয়োগ করা সম্ভব। নিউমেরিক ডেটা আবার পূর্ণসংখ্যা বা ইন্টিজার (যেমন: ২৫, ১০০, -১০) এবং ভগ্নাংশ বা ফ্লোটিং পয়েন্ট (যেমন: ৩.১৪, ৯৯.৯৯) হিসেবে বিভক্ত হতে পারে। মানুষের দৈনন্দিন আর্থিক হিসাব-নিকাশ, বয়স বা পরীক্ষার নম্বর সংরক্ষণে এই ডেটার ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।
- বুলিয়ান ডেটা (Boolean Data): কম্পিউটারের লজিক্যাল বা যৌক্তিক কাজগুলো সম্পাদনের জন্য যে ডেটা ব্যবহৃত হয়, তাকে বুলিয়ান ডেটা বলে। এই ডেটার মান হিসেবে শুধুমাত্র দুটি অবস্থা থাকতে পারে—সত্য (True) অথবা মিথ্যা (False)। আধুনিক ডিজিটাল সার্কিটে এটি মূলত '১' (True) এবং '০' (False) হিসেবে সংকেত প্রদান করে কাজ করে। কোনো শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, তা যাচাই করার জন্য আধুনিক প্রোগ্রামিংয়ে বুলিয়ান ডেটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
- ক্যারেক্টার বা টেক্সট ডেটা (Character/Text Data): বর্ণমালা (A-Z, a-z, অ-ঁ), অঙ্ক (0-9) এবং বিভিন্ন বিশেষ চিহ্ন (যেমন: @, #, $, %) মিলিয়ে যে ডেটা গঠিত হয়, তাকে ক্যারেক্টার বা টেক্সট ডেটা বলা হয়। মানুষের নাম, ঠিকানা, ইমেইল বা পাসওয়ার্ড লেখার ক্ষেত্রে সাধারণত এই ধরনের ডেটা ব্যবহার করা হয়। একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, টেক্সট ডেটার ভেতরে সংখ্যা থাকলেও তার উপর সাধারণ গাণিতিক যোগ-বিয়োগ করা যায় না (যেমন: মোবাইল নম্বর বা পোস্টাল কোডের সংখ্যার উপর গাণিতিক কাজ করা অর্থহীন)।
- মাল্টিমিডিয়া ডেটা (Multimedia Data): বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত এবং জনপ্রিয় ডেটার ধরন হলো মাল্টিমিডিয়া ডেটা। সাধারণ টেক্সট বা সংখ্যার বাইরে যেকোনো ধরনের ছবি (Image), অডিও (Audio), ভিডিও (Video) এবং অ্যানিমেশন (Animation) এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ডিজিটাল মার্কেটিং, বিনোদন জগৎ এবং আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় মাল্টিমিডিয়া ডেটার ব্যবহার দিন দিন অবিশ্বাস্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
গুরুত্বপূর্ণ (Important):
- ডেটা কখনোই একা কোনো পূর্ণাঙ্গ বা স্পষ্ট অর্থ প্রকাশ করতে পারে না। এটি সব সময় খণ্ডিত বা অসম্পূর্ণ অবস্থায় থাকে।
- ডেটা মূলত অগোছালো (Unorganized) অবস্থায় থাকে, তাই এটিকে সরাসরি ব্যবহার করে কোনো সমস্যার সমাধান করা যায় না।
- সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ডেটার কোনো প্রত্যক্ষ ভূমিকা নেই। এটি কেবল সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যের কাঁচামাল হিসেবে কাজ করে।
ইনফরমেশন (Information) বা তথ্য: পরিচিতি ও গুণাবলি
আমরা পূর্বেই জেনেছি যে, ডেটা হলো অগোছালো কাঁচামাল। এই অগোছালো কাঁচামালকে যখন একটি নির্দিষ্ট নিয়মে এবং সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো হয় বা প্রক্রিয়াজাত করা হয়, তখন সেটি একটি অর্থপূর্ণ রূপ লাভ করে। ডেটার এই অর্থপূর্ণ এবং ব্যবহারযোগ্য চূড়ান্ত রূপটিকেই বলা হয় ইনফরমেশন বা তথ্য। 'Information' শব্দটি এসেছে ল্যাটিন শব্দ 'Informare' থেকে, যার অর্থ হলো গঠন করা বা রূপ দেওয়া। অর্থাৎ, বিচ্ছিন্ন ডেটাগুলোকে একটি নির্দিষ্ট কাঠামোতে রূপ দিয়ে মানুষের বোধগম্য করার প্রক্রিয়াই হলো তথ্য তৈরি করা।
সংজ্ঞা (Definition): ডেটা বা উপাত্তকে প্রক্রিয়াকরণ বা প্রসেস (Process) করার পর যে অর্থপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও ব্যবহারযোগ্য চূড়ান্ত রূপ পাওয়া যায়, তাকে ইনফরমেশন (Information) বা তথ্য বলে।
যেকোনো প্রক্রিয়াজাত ডেটাই ইনফরমেশন হতে পারে, কিন্তু একটি ভালো এবং আদর্শ ইনফরমেশন হওয়ার জন্য এর বেশ কিছু বিশেষ গুণাবলি থাকতে হয়। সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য ইনফরমেশনের নিচের বৈশিষ্ট্যগুলো থাকা অপরিহার্য:
- সঠিকতা (Accuracy): ইনফরমেশনকে অবশ্যই শতভাগ নির্ভুল এবং সঠিক হতে হবে। ভুল ডেটা ইনপুট দিলে বা প্রক্রিয়াকরণে ভুল হলে আউটপুট হিসেবে যে ইনফরমেশন পাওয়া যাবে, সেটিও ভুল হবে। আইসিটির ভাষায় একে GIGO বা Garbage In Garbage Out বলা হয়, তাই ভুল ইনফরমেশনের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া সিদ্ধান্ত মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে।
- প্রাসঙ্গিকতা (Relevance): তৈরি হওয়া ইনফরমেশনটি ব্যবহারকারীর প্রয়োজনের সাথে সম্পূর্ণ প্রাসঙ্গিক হতে হবে। অর্থাৎ, ব্যবহারকারী ঠিক যে বিষয়ে জানতে চাইছেন, প্রাপ্ত ইনফরমেশনটি ঠিক সেই বিষয়ের ওপরই হতে হবে। অপ্রয়োজনীয় এবং অতিরিক্ত তথ্য অনেক সময় মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে বা বিভ্রান্তি বাড়ায়।
- সময়োপযোগীতা (Timeliness): ইনফরমেশন অবশ্যই সঠিক এবং নির্দিষ্ট সময়ে পাওয়া যেতে হবে। সময়ের কাজ সময়ে না হলে সেই ইনফরমেশনের কোনো মূল্য থাকে না। উদাহরণস্বরূপ, পরীক্ষার ফলাফল যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর প্রকাশিত হয়, তবে সেই ফলাফল বা ইনফরমেশন শিক্ষার্থীর কোনো কাজেই আসবে না।
- সম্পূর্ণতা (Completeness): একটি ভালো ইনফরমেশন কখনোই খণ্ডিত বা অসম্পূর্ণ হতে পারবে না। আংশিক বা অর্ধেক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া সিদ্ধান্ত অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভুল প্রমাণিত হয়। তাই ইনফরমেশনকে একটি ঘটনার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো চিত্র পরিষ্কারভাবে তুলে ধরতে হবে।
ডেটা প্রসেসিং সাইকেল: ডেটা থেকে জ্ঞান (Knowledge) সৃষ্টির প্রক্রিয়া
কম্পিউটার কীভাবে কাজ করে তা বুঝতে হলে ডেটা প্রসেসিং সাইকেল সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। ডেটা থেকে ইনফরমেশন তৈরি হওয়া এবং সেই ইনফরমেশনের ভিত্তিতে কোনো চূড়ান্ত জ্ঞান বা 'Knowledge' অর্জন করার পুরো প্রক্রিয়াটি একটি নির্দিষ্ট চক্র বা সাইকেল মেনে চলে। এই প্রক্রিয়ার তিনটি মূল ধাপ হলো: ইনপুট (Input), প্রসেসিং (Processing) এবং আউটপুট (Output)।
প্রথমে বিভিন্ন উৎস থেকে বিচ্ছিন্ন ডেটা সংগ্রহ করে কম্পিউটারে ইনপুট হিসেবে দেওয়া হয়। এরপর সিপিইউ (CPU) বা প্রসেসর সেই ইনপুটকৃত ডেটার উপর বিভিন্ন গাণিতিক বা যৌক্তিক বিশ্লেষণ (Processing) চালায়। প্রক্রিয়াকরণের পর যে অর্থপূর্ণ ফলাফল বেরিয়ে আসে, সেটি হলো ইনফরমেশন (Output)। এরপর মানুষের নিজস্ব বুদ্ধি, পূর্ব অভিজ্ঞতা এবং বিশ্লেষণের মাধ্যমে সেই ইনফরমেশন থেকে যে চূড়ান্ত সারাংশ বা বোধগম্যতা তৈরি হয়, তাকে নলেজ বা জ্ঞান (Knowledge) বলা হয়। এটি মূলত তথ্য প্রযুক্তির সুপরিচিত DIKW (Data, Information, Knowledge, Wisdom) মডেলের একটি অংশ।
এই ডেটা প্রসেসিং চক্রটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ঘটে চলেছে। শুধুমাত্র কম্পিউটার বা যন্ত্র নয়, মানুষের মস্তিষ্কও ঠিক একইভাবে চারপাশ থেকে ডেটা সংগ্রহ করে, সেগুলোকে প্রসেস করে এবং প্রতিনিয়ত নতুন নতুন জ্ঞান অর্জন করে।
উদাহরণ (Example):
ধরা যাক, একজন শিক্ষার্থীর তিনটি আলাদা বিষয়ের প্রাপ্ত নম্বর হলো—৮০, ৭৫, এবং ৯০। এই বিচ্ছিন্ন তিনটি সংখ্যা এক একটি 'ডেটা' বা উপাত্ত।
কম্পিউটার বা ক্যালকুলেটর যখন এই তিনটি সংখ্যাকে যোগ করে ৩ দিয়ে ভাগ করে, তখন সেই গাণিতিক কাজটিকে বলা হয় 'প্রসেসিং'।
প্রসেসিংয়ের পর যে গড় নম্বর (যেমন: ৮১.৬৭) এবং গ্রেড (A+) বেরিয়ে আসে, সেটি হলো 'ইনফরমেশন' বা তথ্য।
সর্বশেষে, এই গ্রেড দেখে শিক্ষক বা কর্তৃপক্ষ যখন সিদ্ধান্ত নেন যে "এই শিক্ষার্থীটিকে একটি বিশেষ স্কলারশিপ দেওয়া উচিত", শিক্ষকের এই বিশ্লেষণাত্মক চূড়ান্ত সিদ্ধান্তই হলো 'নলেজ (Knowledge)'।
ডেটা ও ইনফরমেশনের মধ্যে তুলনামূলক পার্থক্য
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ডেটা এবং ইনফরমেশনের পার্থক্য বুঝতে পারা অত্যন্ত জরুরি। কারণ এই দুটি শব্দ দৈনন্দিন জীবনে প্রায়ই একে অপরের পরিপূরক হিসেবে ব্যবহৃত হলেও, এদের প্রযুক্তিগত ও ব্যবহারিক অর্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাতেও এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে চাওয়া হয়। পরীক্ষার খাতায় এই পার্থক্যগুলো সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে পারলে খুব সহজেই ভালো নম্বর অর্জন করা যায়।
পরীক্ষার টিপস (Exam Tip): পরীক্ষায় 'ডেটা ও ইনফরমেশনের পার্থক্য' আসলে অবশ্যই ছক করে ৪-৫টি পয়েন্টে উত্তর লিখবেন। ছকের সর্ববামে 'পার্থক্যের বিষয়/ভিত্তি' নামে একটি কলাম যুক্ত করলে পরীক্ষকের জন্য খাতা মূল্যায়ন করা সহজ হয় এবং আপনি পূর্ণ নম্বর পেতে পারেন। পয়েন্টগুলো অবশ্যই স্পষ্ট ও প্রাসঙ্গিক হতে হবে।
নিচে ডেটা এবং ইনফরমেশনের মধ্যে প্রধান তুলনামূলক পার্থক্যগুলো ছক আকারে তুলে ধরা হলো:
| পার্থক্যের বিষয়/ভিত্তি | ডেটা (Data) বা উপাত্ত | ইনফরমেশন (Information) বা তথ্য |
|---|---|---|
| সংজ্ঞা | সুনির্দিষ্ট ফলাফল পাওয়ার জন্য প্রক্রিয়াকরণের কাজে ব্যবহৃত অসংগঠিত কাঁচামাল বা ফ্যাক্টগুলোকে ডেটা বলে। | ডেটাকে সুনির্দিষ্ট নিয়মে প্রক্রিয়াকরণ করার পর যে অর্থপূর্ণ ও ব্যবহারযোগ্য রূপ পাওয়া যায়, তাকে ইনফরমেশন বলে। |
| অর্থপূর্ণতা | ডেটা একা কোনো সুনির্দিষ্ট অর্থ প্রকাশ করতে পারে না। এটি মূলত অগোছালো ও বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকে। | ইনফরমেশন সবসময় অর্থপূর্ণ, সুশৃঙ্খল এবং ব্যবহারকারীর কাছে সম্পূর্ণ বোধগম্য। |
| নির্ভরশীলতা | ডেটা ইনফরমেশনের ওপর নির্ভর করে না; এটি স্বাধীনভাবে যেকোনো উৎস থেকে সংগৃহীত হতে পারে। | ইনফরমেশন সম্পূর্ণভাবে ডেটার ওপর নির্ভরশীল। সঠিক ও নির্ভুল ডেটা ছাড়া ইনফরমেশন তৈরি সম্ভব নয়। |
| উদাহরণ | রহিমের বয়স '২২', উচ্চতা '৬৬', ওজন '৬৫'—এই বিচ্ছিন্ন সংখ্যাগুলো হলো ডেটা। | "রহিমের বয়স ২২ বছর এবং তার ওজন ৬৫ কেজি"—এই গোছানো বাক্যটি হলো একটি ইনফরমেশন। |
| সিদ্ধান্ত গ্রহণ | অসম্পূর্ণ হওয়ার কারণে ডেটার উপর ভিত্তি করে সরাসরি কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। | ইনফরমেশনের সাহায্যেই মূলত যেকোনো বিষয়ে সঠিক এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব হয়। |
সৃজনশীল প্রশ্নের ধরন ও দৃশ্যপট বিশ্লেষণ
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রায়শই সৃজনশীল বা দৃশ্যপট-ভিত্তিক প্রশ্ন (Scenario-based questions) দেওয়া হয়। এই ধরনের প্রশ্নে একটি উদ্দীপক বা পরিস্থিতি বর্ণনা করে শিক্ষার্থীদের কাছে জানতে চাওয়া হয়—প্রদত্ত বিষয়বস্তুটি ডেটা নাকি ইনফরমেশন? এমন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় দুটি মূল ভিত্তির ওপর জোর দিতে হয়: ১. প্রদত্ত বিষয়টি নিজে থেকে কোনো অর্থ প্রকাশ করছে কি না (Meaningfulness) এবং ২. এর উপর ভিত্তি করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব কি না (Decision-making role)।
এই ধরনের প্রশ্নের উত্তর করার সময় প্রথমে উদ্দীপকের বিষয়বস্তুটি চিহ্নিত করতে হয়। তারপর ডেটা বা ইনফরমেশনের সংজ্ঞা দিয়ে যৌক্তিকভাবে প্রমাণ করতে হয় যে উদ্দীপকের বিষয়টি আসলে কী।
উদাহরণ (Example):
দৃশ্যপট: একটি হাসপাতালের একজন রোগীর ফাইলে লেখা আছে— "১০১.৫", "১১০/৭০", "প্যারাসিটামল"। দৃশ্যপটটি বিশ্লেষণ করে প্রমাণ করো যে, এগুলো ডেটা নাকি ইনফরমেশন?
সমাধানের কৌশল:
প্রথমে উল্লেখ করতে হবে যে, উদ্দীপকে উল্লেখিত "১০১.৫", "১১০/৭০" এবং "প্যারাসিটামল" শব্দ বা সংখ্যাগুলো একেকটি বিচ্ছিন্ন 'ডেটা'।
যুক্তি: আমরা জানি, তথ্যের ক্ষুদ্রতম বা অসংগঠিত একক যা একা কোনো অর্থ প্রকাশ করতে পারে না, তাকে ডেটা বলে। উদ্দীপকের ১০১.৫ সংখ্যাটি দিয়ে কী বোঝানো হচ্ছে—তা স্পষ্ট নয়। এটি জ্বর, নাকি কোনো কক্ষ নম্বর, তা বোঝার কোনো উপায় নেই। যেহেতু এগুলো সুশৃঙ্খল নয় এবং এগুলো পড়ে রোগীর অবস্থা সম্পর্কে সরাসরি কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না, তাই এগুলো ডেটা।
কিন্তু ডাক্তার যদি এগুলো প্রসেস করে ফাইলে গুছিয়ে লিখে দিতেন, "রোগীর শরীরের তাপমাত্রা ১০১.৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট, রক্তচাপ ১১০/৭০ এবং তাকে প্রতিদিন প্যারাসিটামল খেতে হবে", তখন সেটি একটি অর্থপূর্ণ 'ইনফরমেশন' হিসেবে বিবেচিত হতো।
সংক্ষিপ্ত সারাংশ (Quick Revision):
- ডেটা (Data) হলো তথ্যের ক্ষুদ্রতম একক বা অসংগঠিত ফ্যাক্ট, যা প্রক্রিয়াকরণের প্রাথমিক কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
- ইনফরমেশন (Information) হলো সুশৃঙ্খল ও প্রক্রিয়াজাত ডেটা, যা ব্যবহারকারীর কাছে সম্পূর্ণ অর্থবোধক।
- ইনপুটকৃত ডেটার উপর প্রক্রিয়াকরণ (Processing) চালানোর মাধ্যমেই তা চূড়ান্ত ইনফরমেশনে পরিণত হয়।
- ইনফরমেশনের উপর ভিত্তি করেই মানুষ অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা Knowledge তৈরি করে থাকে।
- বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে ডেটা মূলত চার প্রকার হতে পারে: নিউমেরিক, বুলিয়ান, ক্যারেক্টার বা টেক্সট এবং মাল্টিমিডিয়া।
- একটি আদর্শ ইনফরমেশনের সঠিকতা, প্রাসঙ্গিকতা, সময়োপযোগীতা এবং সম্পূর্ণতা—এই চারটি গুণাবলি থাকতে হয়।
পরিভাষা (Glossary)
| পরিভাষা (Term) | সংজ্ঞা (Definition) |
|---|---|
| Data (উপাত্ত) | তথ্যের ক্ষুদ্রতম একক বা অসংগঠিত ফ্যাক্ট, যা প্রসেসিংয়ের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং একা কোনো অর্থ প্রকাশ করতে পারে না। |
| Information (তথ্য) | ডেটাকে নির্দিষ্ট নিয়মে প্রক্রিয়াজাত করার পর যে অর্থপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল ফলাফল পাওয়া যায়, যা সরাসরি সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাহায্য করে। |
| Data Processing (ডেটা প্রক্রিয়াকরণ) | যে ধারাবাহিক গাণিতিক ও যৌক্তিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইনপুটকৃত অগোছালো ডেটাকে আউটপুট বা সুশৃঙ্খল ইনফরমেশনে রূপান্তর করা হয়। |
| Boolean Data (বুলিয়ান ডেটা) | যে ধরনের লজিক্যাল ডেটার মান শুধুমাত্র দুটি অবস্থার যেকোনো একটি—সত্য (True/1) অথবা মিথ্যা (False/0) হতে পারে। |
| Numeric Data (নিউমেরিক ডেটা) | যে ডেটা শুধুমাত্র অঙ্ক বা সংখ্যা (পূর্ণসংখ্যা বা ভগ্নাংশ) নিয়ে গঠিত এবং যার উপর সরাসরি গাণিতিক অপারেশন (যোগ, বিয়োগ ইত্যাদি) চালানো সম্ভব। |
| Knowledge (জ্ঞান) | প্রক্রিয়াজাত ইনফরমেশনকে মানুষের নিজস্ব বুদ্ধি, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং পূর্ব অভিজ্ঞতার আলোকে কাজে লাগিয়ে অর্জিত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা বোধগম্যতা। |